যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, কাস্পিয়ান সাগরে নিজেদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ইরান। ফলে এই অঞ্চলের সংঘাত এখন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

টানা ১৩ রাত বিমান হামলার পর গত শনিবার ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নৌ অবরোধ এখনো পুরোপুরি বহাল রয়েছে। তবে হঠাৎ করে কেন এই হামলা বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একই দিনে ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে কোনো পাল্টা হামলা চালায়নি, যদিও এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা প্রায় প্রতিদিনই পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে আসছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প সবসময় কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে আলোচনার টেবিলে না এলে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে, তা তিনি ইরানকে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন। এদিকে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরপরই প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি সূত্র জানায়, আপাতত সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা বন্ধ থাকলেও শনিবার ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সংঘাতের ফলে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ লোহিত সাগরের বাব আল–মানদেবও চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ আবার নতুন করে জোরালো হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, শনিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবু স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছেন। রয়টার্সের যাচাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জিজানে আরামকোর শোধনাগারের দিক থেকে ঘন ধোঁয়া উড়ছে। এই শোধনাগারটির প্রতিদিন প্রায় চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এ হামলার বিষয়ে আরামকোর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

অন্যদিকে, ইয়ানবুতে তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী। লোহিত সাগরতীরের এই বন্দরটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির সৌদি–সমর্থিত সরকারের বিমানবাহিনী মারিব ও আল–জাওফ প্রদেশে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দুই পক্ষই রণাঙ্গনে সেনা মোতায়েন বাড়াতে শুরু করেছে।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটাই কমে আসলেও চলতি মাসে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে হুতিরাও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনাই এখন তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।