দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের এক অভিনব প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস। তবে এই গ্যাস আমদানিতে প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ১০০ টাকা, যা বর্তমানে শিল্প খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দামের তুলনায় তিনগুণ বেশি। ক্রায়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এত চড়া মূল্যের কারণে দেশের শিল্পমালিকরা এই গ্যাস নিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

সম্প্রতি সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলায় আয়োজিত এক বৈঠকে পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল এই প্রস্তাব উত্থাপন করে। বৈঠকে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন বা বিটিএমএ-এর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া বিটিএমএ প্রতিনিধি রাজীব হায়দার জানান, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সবাই বিকল্প উৎসের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও এত চড়া দামে গ্যাস কেনা অত্যন্ত কঠিন।

পেট্রোনাসের মহাব্যবস্থাপক নরহামিজাম বিন নরদিনের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি নারায়ণগঞ্জের জেরা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসরকারি সুগার মিল পরিদর্শন করবে। সেখানে তারা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের বাস্তব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে সরকার এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানি বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা। পেট্রোনাসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০ ফুট (৯ টন ধারণক্ষমতা) এবং ৪০ ফুট (১৮ টন ধারণক্ষমতা) বিশিষ্ট কনটেইনারের মতো গ্যাস ট্যাংক জাহাজে করে বাংলাদেশে পাঠানো হবে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৬০০টি এমন ট্যাংক থাকতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর লরির মাধ্যমে এসব ট্যাংক সরকারের গ্যাস পাইপলাইন বা সরাসরি শিল্প এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। তবে এই গ্যাস ব্যবহারের জন্য গ্রাহক পর্যায়ে রিজার্ভ ট্যাংক ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপনে বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে এই এলএনজি পৌঁছাতে সাধারণত ৭ দিন সময় লাগবে।

বর্তমানে দেশে প্রতি ইউনিট শিল্প গ্যাসের দাম ৩১ টাকা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চড়া দামের কারণে পেট্রোবাংলাকে প্রতি ইউনিট আমদানি করতে হচ্ছে ৬৬ টাকায়। পেট্রোনাসের প্রস্তাবিত ১০০ টাকার দর এই আমদানিমূল্যের চেয়েও অনেক বেশি। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, গ্যাস সংকটে দেশে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে ২৫ টাকার বেশি দরে ফার্নেস অয়েল কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। এখন এই চড়া মূল্যের গ্যাস এনে কতটা সাশ্রয় হবে, তা বিশ্লেষণ করছে পিডিবি।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১০ ডলার থেকে বেড়ে ২২ ডলারে ঠেকেছে। ফলে সরকারের গ্যাস খাতের মোট ব্যয়ের ৬৯.৫৯ শতাংশই চলে যাচ্ছে এলএনজি আমদানিতে। গত বছর এলএনজি আমদানিতে সরকারের ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এবার তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে গ্যাস সংকটের ভয়াবহতার কারণে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েও গত ৫ বছর ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে প্রায় ৫৫০টি শিল্পকারখানা।

সারা দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। সিএনজি পাম্পে গ্যাস না থাকার পরও পাম্পগুলোর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে শত শত প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশা। বাসার গ্যাসের চুলাগুলোও বন্ধ। শিল্পকারখানার চাকা ঘুরছে না। গ্যাসের অভাবে কয়েক হাজার শিল্প চরম সংকটের মুখে। দু-চার দিনের মধ্যে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল চালুর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কবে চালু হবে তাও জানে না কেউ। এই অনিশ্চিত অবস্থায় মালয়েশিয়ার তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস ক্রোয়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের শিল্পমালিকদের। তারা প্রতি ইউনিট গ্যাসের মূল্য ৩১ টাকার বদলে ১০০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পেট্রোনাস জানিয়েছে, আইএসও পদ্ধতিতে ৭-১০ দিনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস এনে বাংলাদেশের শিল্পে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব। মূল্য বেশি হলেও এতে বাংলাদেশের চলমান গ্যাসের সংকট কিছুটা হলেও কাটবে। পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলায় গিয়ে আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সেখানে আয়োজিত বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ’র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।