ইরানে টানা সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তির অস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তির সঙ্গে নতুন কোনো যুদ্ধ বাধলে ওয়াশিংটন বড় ধরনের অস্ত্র সংকটে পড়তে পারে। তবে এই উদ্বেগের মধ্যেই সম্প্রতি পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের আরও দ্রুত ও বেশি অস্ত্র তৈরির তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই যুদ্ধ-সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতার রক্ষাকবচ’ বলে অভিহিত করেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইরানে প্রায় ৪০ দিনের জোরাল সামরিক অভিযানে মার্কিন সরকারের এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি (৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন) ডলার, যার বড় অংশই খরচ হয়েছে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে। গত ৮ এপ্রিল তেহরানের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রতি ইরানে হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত মার্কিন বাহিনী দেশটির ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। একই সময়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ১ হাজার ৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি না করার জন্য ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগার পুরোপুরি খালি হয়ে পড়বে। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই ঘাটতির কথা অস্বীকার করে দাবি করেছেন, বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে তাঁদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এই ঘাটতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রথমে অস্ত্র কমে যাওয়ার তথ্য অস্বীকার করলেও, গত সপ্তাহে তিনি মার্কিন সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিকে জানান যে সামরিক সরঞ্জামসহ জরুরি ঘাটতি মেটাতে পেন্টাগনের আরও ৮ হাজার ৭০০ কোটি (৮৭ বিলিয়ন) ডলার প্রয়োজন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর তথ্যমতে, মার্কিন অস্ত্রাগার শূন্য হয়ে পড়ার চিত্রটি বেশ ভয়াবহ। সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় এবং হুট করে এর উৎপাদন বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ দিয়ে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোই এখন মূলত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার আক্রমণ পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল (টিএলএএম)। যুদ্ধজাহাজ বা সাবমেরিন থেকে ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানা যায়। সিএসআইএসের হিসাব মতে, এই যুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার প্রতিটির পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ডলার। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ২০৩১ সালের আগে এই অস্ত্রের মজুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুমানিক ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র জমা ছিল, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৩০টি ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের পেছনে খরচ হয় প্রায় ৪০ লাখ ডলার, যা দিয়ে ইরানের মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের ড্রোন ধ্বংস করতে হচ্ছে।
প্যাট্রিয়টের পাশাপাশি দীর্ঘপাল্লার ও উঁচুতে আঘাত হানতে সক্ষম ‘টার্মিনাল হাই আলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে থাকা ৩৬০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি ইতিমধ্যে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সচল থাকা মাত্র ৯টি থাড ব্যাটারির মধ্যে ৭টিই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাশিয়া, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় অত্যন্ত জরুরি এই ব্যবস্থার এমন ঘাটতি মার্কিন বাহিনীকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যাকে ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বা ডেভিডসন সময়সীমা বলা হয়, যার মধ্যে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিআইএর সাবেক পরিচালক উইলিয়াম বার্নসও পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে ২০২৭ সালের মধ্যে চীন তাইওয়ান আক্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে।
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত। অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন অস্ত্রাগার খালি হওয়া ঠেকাতে ইউক্রেনকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি জানান, মার্কিন বাহিনী অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম দিনই ৮০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র মাসে বড়জোর ৬০ থেকে ৬৫টি এবং বছরে ৭০০ থেকে ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। এই ঘাটতি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় প্রভাব ফেলছে। তবে ট্রাম্প ইউক্রেনকে তাদের নিজেদের দেশেই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ইলেইন ম্যাককাস্কার মনে করেন, এই দুই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখন কম খরচে বিপুল অস্ত্র তৈরির পথ দেখাবে।
অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের সবাই এই ঘাটতিকে কেবল ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না। সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা জ্যাকব অলিডর্ট মনে করেন, রেকর্ড সময়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তির জানান দিয়েছে, যা চীনসহ অন্যান্য প্রতিপক্ষকে কঠোর বার্তা দেবে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত এখন অনেক বেশি শোচনীয়। ‘ইউনাইটেড অ্যাগেইন্সট নিউক্লিয়ার ইরান’-এর নীতিবিষয়ক পরিচালক জেসন ব্রডস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল ভিত্তি বা উৎপাদন কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের হাতে এখন সামান্য অস্ত্রই অবশিষ্ট রয়েছে, যা তারা হরমুজ প্রণালিতে হামলার হুমকি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চাচ্ছে। ব্রডস্কির মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ঝুঁকিটি কিছুটা দূরের বিষয় হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।