ফিফা বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের কাছে টুর্নামেন্টটি যেন এখনও শেষ হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে দ্বিতীয়বারের মতো স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের রেশ কাটার আগেই কট্টর ডানপন্থী এই প্রেসিডেন্ট অভিযোগ তুলেছেন যে, বিশ্বকাপজুড়ে একটি পরিকল্পিত ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ চালানো হয়েছিল। তার দাবি, আর্জেন্টিনার জাতীয় দল, সমর্থক এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এই সমন্বিত ষড়যন্ত্র করা হয়।

সম্প্রতি এক রেডিও সাক্ষাৎকারে মিলেই দাবি করেন, এই প্রচারণার পেছনে অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সরকার। তিনি বলেন, প্রগতিশীল শক্তিগুলো স্বাধীনতার ধারণার সাফল্য দেখতে চায় না বলেই এমন কাজ করেছে। তার মতে, এই প্রচারণার সবচেয়ে বড় অর্থদাতা ছিল ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকার।

বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পক্ষপাতিত্বের সুবিধা পাওয়া, সমর্থকদের বর্ণবাদী আচরণ এবং ফিফার মাধ্যমে লিওনেল মেসিদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার দাবিগুলোকে পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ বলে মনে করেন মিলেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সংকট এবং নিজের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা থেকে জনগণের নজর সরাতেই প্রেসিডেন্ট এমন ভিত্তিহীন দাবি করছেন। অনেকে উল্টো মিলেইয়ের কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতিকেই প্রকৃত ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

অবশ্য বুয়েনস আইরেসের ৫২ বছর বয়সী বই বিক্রেতা পাবলো তোরেসের মতো সাধারণ মানুষের ওপর এই প্রচারণার প্রভাব পড়েছে। নিজেকে মিলেইয়ের সমর্থক না দাবি করলেও পাবলো জানান, সামাজিক মাধ্যমে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে চলা মিথ্যাচার তাকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। এদিকে ফাইনালের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন অভিনেতা স্যামুয়েল এল. জ্যাকসন ইনস্টাগ্রামে কৃষ্ণাঙ্গদের আর্জেন্টিাকে সমর্থন না করার আহ্বান জানিয়ে দেশটিকে ইতিহাসের অন্যতম বর্ণবাদী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আর্জেন্টিনা দেশটিতে বর্ণবাদের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও, পুরো দেশকে একটি নেতিবাচক ছাঁচে ফেলার সমালোচনা করে।

প্রেসিডেন্ট মিলেই অবশ্য দেশের বর্ণবাদী ভাবমূর্তি তৈরির জন্য দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়ী করেছেন। সম্প্রতি ব্রাজিল সফরে গিয়ে কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর (সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে) নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলাকে ‘চোর’ ও ‘কারাবন্দি’ বলে আক্রমণ করেন, যা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। মিলেইয়ের দাবি, তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি আক্রমণ এসেছে ব্রাজিল থেকে। পরের দিন তিনি এই তালিকায় মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নামও যোগ করেন।

তবে ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী মার্সেডেস মাসপেরো প্রায় ২০ লাখেরও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, পরিকল্পিত কোনো আন্তর্জাতিক প্রচারণার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। আর্জেন্টিনার জাতীয় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণা পরিষদের গবেষক নাটালিয়া আরুগুয়েতেও জানান, বৈরী আলোচনা থাকলেও এতে ব্রাজিল বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সমন্বিত সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৭৬-৮৩ সালের সামরিক জান্তার পর এই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধানের স্তর থেকে এমন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সামনে আনা হলো। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের সময়ও তৎকালীন সামরিক শাসকরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা ঢাকতে ‘আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণা’র তত্ত্ব ব্যবহার করেছিল।