তিন মাসের ব্যবধানে আবারও ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আইনটিকে আরও কঠোর করতে নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের মতো অপরাধের সংজ্ঞায় অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
সংশোধিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, ২৬/ক নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। খসড়ায় গুজব ও অপতথ্যের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। গুজব বলতে বোঝানো হয়েছে এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে অথবা তৈরির ঝুঁকি থাকে। অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ বা প্রচার করা হয়।
এছাড়া ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার অপরাধে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করতে কোনো তথ্য অডিও, ভিডিও চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য উপায়ে ধারণ বা সম্পাদিত, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করে কিছু প্রচার করলে শাস্তি বেড়ে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও বিভ্রান্তিকর ছবি দিয়ে অপপ্রচার ঠেকাতেই এই কঠোর শাস্তির বিধান আনা হচ্ছে। তবে আইনবিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদদের একাংশ এই উদ্যোগের সমালোচনা করছেন। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই সংশোধনীর ফলে আইনের অপপ্রয়োগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও অবনমিত হতে পারে। সমালোচকরা মনে করছেন, সরকার পুনরায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুগে ফিরে যাচ্ছে এবং এ ধরনের কঠোর আইন প্রণয়নের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
সরকারের অভ্যন্তরীণ মহলেও এই সংশোধন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষায় এটি জরুরি বলে যুক্তি দিচ্ছেন, আবার অনেকের মতে, এটি সমালোচনার জন্ম দেবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈশ্বিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করেছিল। পরবর্তীতে গত ৩০ এপ্রিল অধ্যাদেশ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ সংসদে পাস হয়। বিলটি পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় আবারও সংশোধনের এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যা সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে পাস হতে পারে বলে জানা গেছে।
কেউ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন, কেউ বিরোধিতা করে বলছেন, এতে সমালোচনা হবে, অপপ্রয়োগ হবে, বৈশ্বিক চাপ আসবে।আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়।