দেশের মানুষের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন আতঙ্ক—মাইক্রোপ্লাস্টিক। সয়াবিন তেল, চিনি এবং শিশুদের জন্য কেনা দুধের মতো অপরিহার্য খাদ্যপণ্যে এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে। দেশের তিনটি পৃথক গবেষণায় এই দূষণের প্রমাণ পাওয়ার পর জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, প্রতিদিন অজান্তেই হাজারো প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমানের করা এই গবেষণায় প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি ও খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা শনাক্ত হয়েছে। উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ থেকে এসব কণা চিনির সঙ্গে মিশছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, বাজারজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন। গবেষণার তথ্যমতে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬.৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩.৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০.৮টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন পর্যায়ে এই দূষণ ঘটছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে খোলা তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। এই গবেষণায় ছয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এলসেভিয়ারে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের পাত্রের পুনর্ব্যবহার এবং খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রির কারণে দূষণের মাত্রা বাড়ছে।

গবেষণায় পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পিইটি, নাইলন, পিভিসি, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফাইবার বা আঁশজাতীয় কণা সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি কণা ঢুকছে। যদিও এই কণাগুলো সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি, তবে শরীরে জমে থাকা এসব কণা দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং স্নায়বিক জটিলতা বাড়াতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন এই পরিস্থিতিতে মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর গাফিলতি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যেসব খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো আবারও পরীক্ষা করে বাজার থেকে প্রত্যাহার করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ জানান, এই কণা রক্তনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অন্ত্রের হজমজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এতে বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, দুধ সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপেই প্লাস্টিক কণা খাদ্যে যুক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে পাওয়া গেছে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি ও খোলা তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ খোলা তেলে দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশ্বখ্যাত জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস এপ্রিলে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এতে সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এছাড়া নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারেও একটি গবেষণা প্রকাশ হয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া যায়। তাদের ধারণা, প্লাস্টিকের পাত্রের পুনর্ব্যবহার, খোলা অবস্থায় খাদ্য বিক্রি ও সংরক্ষণে অনিয়ম এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ এসব দূষণের অন্যতম কারণ। বোতলজাত তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ায় উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং ও পরিবহণের বিভিন্ন ধাপকে সম্ভাব্য উৎস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।