ইসলামের অন্যতম প্রধান মূলনীতি হলো মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখা এবং বিদ্বেষের উপাদানগুলো দূর করা। কিন্তু এই মহান আদর্শকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে চোগলখুরি বা নামিমা। শরিয়তের পরিভাষায়, মানুষের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টি এবং শত্রুতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে বেড়ানোই হলো চোগলখুরি। এটি সমাজে বিভেদ তৈরি করে এবং দীর্ঘদিনের অটুট সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।

কোরআন ও হাদিসে এই অভ্যাসকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং একে কবিরা গুনাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর অনুসরণ করো না তার, যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়। যে কল্যাণের কাজে বাধা দান করে, যে সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ' (সুরা কালাম : ১০-১২)। এছাড়া মহানবী (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, 'চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না' (বোখারি : ৬০৫৬; মুসলিম : ১৯১)।

আলেমদের মতে, চোগলখুরি অনেকগুলো হারাম ও ধ্বংসাত্মক পাপের সমষ্টি। যদি চোগলখোর ব্যক্তি সত্য বলে, তবে সে বিশ্বাসঘাতকতা করে; আর মিথ্যা বললে সে স্পষ্ট মিথ্যাবাদী। রাসুলুল্লাহ (সা.) চোগলখোরদের নিকৃষ্টতম মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যারা আপনজনদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টি করে নির্দোষ লোকদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। চোগলখুরির সাথে গিবতের মতো বড় গুনাহও যুক্ত থাকে। সাধারণত চোগলখুরি হলো কারও কথা তার অজান্তে অন্যের কাছে বলা, যা ওই ব্যক্তির মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

চোগলখুরির ভয়াবহতা সম্পর্কে মহানবী (সা.) কবরের আজাবের উদাহরণ দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, তাদের আজাব দেওয়া হচ্ছে, তবে কোনো বড় অপরাধের জন্য নয়; তাদের একজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক থাকত না এবং অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত (বোখারি : ২১৮)।

যদি কেউ আপনার কাছে কারও নামে কোনো কথা লাগিয়ে দেয়, তবে ইসলামী আলেমগণ ছয়টি করণীয় নির্ধারণ করেছেন: ১. ওই চোগলখোরের কথা বিশ্বাস করবে না। ২. তাকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে। ৩. তথ্য যাচাই করা। ৪. যার সম্পর্কে বলা হয়েছে তার প্রতি খারাপ ধারণা না করা। ৫. ওই কথার কারণে কাউকে অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরির মাধ্যমে খোঁজ করবে না। ৬. নিজেও ওই লাগানো কথা অন্যদের মাঝে ছড়াবে না। বরং আল্লাহর সাহায্য চেয়ে, শুধু তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এগুলো এড়িয়ে চলবে। এ রকম ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ ও বুঝদার লোকদের আচরণ আমরা সালাফদের মাঝে দেখতে পাই। এক ব্যক্তি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর কাছে গিয়ে বলল, ‘অমুক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘ওটা তো তার নিজের আমল, সে যা ইচ্ছা তাই করবে।’ ১৮. চোগলখোরদের বার্তাবাহক হিসেবে গ্রহণ না করে তাদের সতর্ক করে দেওয়া।

পরিশেষে, জিহ্বাকে হেফাজত করা ঈমানের অংশ। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে' (বোখারি : ৬০১৮)। আল্লাহ আমাদের এই ভয়াবহ পাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।