দেশে বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ পাড়ি জমাতে চান ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা অস্ট্রেলিয়ায়। এদের সিংহভাগই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তবে পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে, জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার এই স্বপ্ন অনেকের ক্ষেত্রেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। বিদেশে পাঠানোর নাম করে গজিয়ে ওঠা একশ্রেণির অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও কনসালট্যান্সি ফার্ম ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, জাল ই-ভিসা ও অস্তিত্বহীন নিয়োগপত্র দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া এমন ১৫টি প্রতারণার মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রগুলো মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারকে টার্গেট করছে। এসব মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রতারকরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পরিচিত দালালের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে। এরপর উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের হাতে জাল বা অকার্যকর কাগজপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং টাকা ফেরত চাইলে দেওয়া হয় হুমকি।
এমনই এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন মোজাম্মেল হক নামের এক ব্যক্তি। তার গ্রামের ১৩ জন মানুষকে উজবেকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, সার্বিয়া ও ব্রুনাইয়ে চাকরি দেওয়ার নামে এক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোট ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু ওয়ার্ক পারমিটের বদলে তাদের দেওয়া হয় টুরিস্ট ভিসা। তিনজনকে উজবেকিস্তানের কথা বলে শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়ে আটকে রাখা হয় এবং উজবেকিস্তানে যাওয়া একজনও কোনো কাজ পাননি। তাদের খাওয়া-দাওয়া ও দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য মোজাম্মেলকে আরও ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার টুরিস্ট ভিসা দিয়ে বিমানবন্দরে পাঠানো হলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফেরত পাঠায়। এরপর আগের টাকাতেই সার্বিয়ায় পাঠানোর নামে যে ভিসা দেওয়া হয়, অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায় সেগুলোও জাল।
আরেকটি বড় অঙ্কের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে পল্টন থানায় দায়ের করা একটি মামলায়। মারহাবা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, জেএস ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্সির দুই প্রতিনিধি সার্বিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব দেন। সার্বিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুই বছরের টিআরসি কার্ডসহ জনপ্রতি ৬,৭৫,০০০ টাকা চুক্তিতে ১৮ জনের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই যাত্রীরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানায় যে তাদের সরবরাহ করা সার্বিয়ার ই-ভিসাগুলো সম্পূর্ণ জাল।
একইভাবে প্রতারিত হয়েছেন পড়াশোনা না জানা শাসছু মিয়া। পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে নয়াপল্টনের একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সৌদি আরবে এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তি হলেও শাসছু মিয়া ধাপে ধাপে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। পরবর্তীতে তাকে যে ভিসা দেওয়া হয়, তা যাচাই করে দেখা যায় সেটি জাল ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স, ভিসার সত্যতা এবং নিয়োগকর্তার তথ্য সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ধরনের মৌখিক প্রতিশ্রুতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বর্তমানে এই প্রতারণা চক্রগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।