গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব এক আলোচনার মাধ্যমে 'মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স' বা বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ এই জোট প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির আলোকেই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থকে বৈদেশিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার কাঠামো হিসেবেই এই জোট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ১৪টি দেশ ও ৩টি জলপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পথ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এসব জলপথ ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর হিসেবে কাজ করে। ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের মূল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় সৌদি আরব এই জোট গঠনের পদক্ষেপ নিয়েছে, কারণ বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব বাণিজ্য এবং নিরাপদ সমুদ্রপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে যায়, যার একটি বড় অংশ সুয়েজ খাল ও বাব-আল-মানদেব প্রণালী ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক সময়ে জলদস্যুতা, সশস্ত্র হামলা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ফলে রপ্তানি পণ্যের নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জাহাজ চলাচলের সময় ও খরচ উভয়ই কমবে। একইভাবে বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহারের প্রয়োজনও হ্রাস পাবে এবং তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও স্থিতিশীল হবে।

এই নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে ৩৫ লক্ষ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত আছেন। এছাড়া অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে। সমুদ্রপথ নিরাপদ হলে পরিবহন ব্যয় ও জাহাজের বীমা হ্রাস, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ফলে অতিরিক্ত ফেইট চার্জ ও আমদানি-রপ্তানির খরচ কমবে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।

সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই জোট বাংলাদেশকে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দেবে। এই আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী কনভয় এসকর্ট, সমুদ্র নিরাপত্তা ও সমন্বিত অভিযানে বাস্তব আভিযানিক অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। একইসঙ্গে মেরিটাইম ডোমেইন সচেতনতা, স্যাটেলাইট সার্ভেল্যান্স, ইউএভি অপারেশন, তথ্য বিনিময় এবং এআই-ভিত্তিক মেরিটাইম ট্র্যাফিকিং সম্পর্কেও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। সামগ্রিকভাবে, বাব-আল-মানদেব প্রণালী রক্ষায় এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারকেই তুলে ধরে।