স্বাবলম্বন বা নিজের ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ ও সফলতা। ইসলামে আত্মনির্ভরশীলতাকে কেবল জাগতিক বিষয় হিসেবে নয়, বরং ঈমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়। অলৌকিক কোনো অবাস্তব কল্পনায় গা না ভাসিয়ে নিজের মেধা, যোগ্যতা ও মহামূল্যবান মস্তিষ্কের ওপর ভরসা করে শূন্য থেকে শুরু করাই একজন স্বাবলম্বী মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এমন মানুষ নিজের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি চারপাশের মানুষের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিতে দ্বিধা করেন না।

জীবনযুদ্ধে স্বাবলম্বী না হলে কতটা পিছিয়ে পড়তে হয়, তা একটি বাস্তব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। একবার এক চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে এক ব্যক্তি অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরে হাজির হলেন। পোশাক নোংরা হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি উত্তর দেন, তার গৃহকর্মী ছুটিতে আছে এবং তার মা তাকে কাপড় ধোয়া শেখাননি! নিজের বিছানা গোছানো, সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, জুতো যথাস্থানে রাখা বা নিজের এক গ্লাস পানি নিজে ঢেলে খাওয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোও যারা করতে পারেন না, তারা আসলে জীবনযুদ্ধে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েন।

অথচ মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক রাসুলুল্লাহ (সা.) শৈশব থেকেই ছিলেন স্বাবলম্বিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জন্মের আগেই পিতৃহীন হওয়া এই মহান মানুষটি মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারান এবং নয় বছর বয়সে তাঁর দাদাও মারা যান। এরপর চাচার কাছে লালিত-পালিত হলেও এতিম শিশু হিসেবে বসে থাকেননি। চাচা তাকে মরুভূমিতে মেষ চরাতে দিতে না চাইলেও তিনি নিজের আগ্রহে সেই পরিশ্রমসাধ্য কাজ বেছে নেন। তরুণ বয়সে মরুভূমির দীর্ঘ পথ, পানির তৃষ্ণা ও যাত্রাপথের নানা কষ্ট সহ্য করে বাণিজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং সফল হন। নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার এই প্রবল ইচ্ছাই তাকে মহিমান্বিত করেছে। এমনকি মদিনায় ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণের সময়ও তিনি সবার সঙ্গে মাটি কাটা ও বহনের কাজে অংশ নিয়েছিলেন। এই পরিশ্রমী মনোভাবের কারণেই তিনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র সফল হয়েছেন।

মুসলমানদের জন্য পরকালের বিশ্বাসের পাশাপাশি দুনিয়াবি জীবনের স্বাবলম্বিতাও অত্যন্ত জরুরি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়া ও পরকাল উভয়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করতে শিখিয়েছেন, যার বর্ণনা রয়েছে সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতে। দুনিয়াবি কল্যাণের জন্য সম্পদে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদ রয়েছে ইসলামে। তবে সম্পদ অর্জনের পর কৃপণতা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অপচয়-অপব্যয়ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুরা আরাফের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা পানাহার করো কিন্তু অপচয় করো না, কারণ আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও লোকালয় থেকে নির্জনে বাসকারী বান্দাকে ভালোবাসেন (মুসলিম: ৭৩২২)।

সন্তানদের পরমুখাপেক্ষী না রেখে তাদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়াকেও ইসলাম উত্তম মনে করে। বিদায় হজের বছর সাহাবি সাদ ইবনে মালেক (রা.) গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে যান। সাদ (রা.) নিজের সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক আল্লাহর পথে সদকা করার অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে এক-তৃতীয়াংশ দান করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এটিই অনেক বেশি। সন্তানদের নিঃস্ব অবস্থায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করার মতো পরিস্থিতিতে রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সম্পদশালী রেখে যাওয়া অনেক উত্তম (বোখারি: ৩৯৩৬)।

সম্পদে স্বাবলম্বী হলে অন্যের হক আদায় করা, পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা এবং দান-সদকা, জাকাত, হজ বা মসজিদ নির্মাণের মতো আর্থিক ইবাদতগুলো সহজে পালন করা যায়। হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওপরের হাত (দাতার হাত) নিচের হাত (গ্রহীতার হাত) থেকে উত্তম। তিনি প্রথমে নিজের পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালনের এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি পরমুখাপেক্ষী না হয়ে পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন (বোখারি: ১৪২৭)।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এ দেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকে উপেক্ষা করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষিবিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক আজ কৃষি, মৎস্য ও পশুপালনে নিয়োজিত হয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিকল্পনার সুফল নিয়ে গ্রামীণ যুবকদের এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।