দেশে হামের প্রকোপে সন্তান হারানোর পাশাপাশি পরিবারগুলো যে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন জরিপে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) যৌথভাবে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবার হামের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ছয়টি বা প্রায় ৬১ শতাংশ পরিবার তাদের জমানো সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিটি পরিবার চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে গড়ে ১৬ হাজার টাকা করে ব্যয় করেছে। এর বাইরে ৪ শতাংশ পরিবার নিজেদের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ৭৫ শতাংশ রোগীর বয়স ৪ বছরের নিচে। এছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোগী রয়েছে ৬ শতাংশ। পেশাগত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থান করার ফলে অনেকে আয় হারিয়েছেন, এমনকি চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।

রংপুরের বাসিন্দা হাজেরা খাতুন তার ১১ মাস বয়সী মেয়ের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক বেশি। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, ওষুধ, খাবার এবং মেডিকেল পরীক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে তিনি আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত থাকলেও বেতন না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সব পরিবারই আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধের জন্য, ৩৩ শতাংশ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তার জন্য এবং ২২ শতাংশ খাদ্য সহায়তার জন্য জরুরি আবেদন জানিয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে প্রতি পরিবার ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম জানান, স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি অনেক পরিবার বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। আইএফআরসি’র হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা ও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়া বিডিআরসিএস সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছে এবং ১ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক মাঠে সচেতনতামূলক কাজ করছেন।