ঢাকার সাভারের একাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পদে স্থানীয় সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজে, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর ছোট ভাই—তিনজনেই এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকলেও এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে তা মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বেসরকারি সব স্কুল ও কলেজের পরিচালনা কমিটি ভেঙে দিয়েছিল। তখন উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি-সংক্রান্ত প্রবিধানমালায় (ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের) সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমা ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালের প্রবিধানমালা অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভাপতি হতে পারতেন। নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত ওই প্রবিধানমালার কিছু অংশ অবৈধ ঘোষণা করেন, যার ফলে সংসদ সদস্যরা নিজ নির্বাচনী এলাকায় চাইলেও সভাপতি হতে পারেন না। এছাড়া ২০২০ সালে উচ্চ আদালতের আরেক রায়ে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না সংসদ সদস্যরা।
গত ৯ জুলাই সাভারের গাজিরচট আকবর মন্ডল উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মোজাফফর হোসাইন জানান, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। সভাপতি হিসেবে সংসদ সদস্যের নামসহ তিনজনের নাম ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতের রায় ও মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের মূল চেতনা অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটিতেও সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ তাঁকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছে এবং নিয়মনীতির ব্যত্যয় হলে বোর্ড তা জানাতো।
সংসদ সদস্যের স্ত্রী সাবিনা সিদ্দিকাকে সাভারের মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি করা হয়েছে। অথচ আগের সভাপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের ২৪ এপ্রিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল শিহাব উদ্দিন খানকে দুই বছরের জন্য সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ২৩ জুলাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন আহমেদের সই করা চিঠিতে শিহাব উদ্দিন খানকে সরিয়ে সাবিনা সিদ্দিকাকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগের সভাপতি শিহাব উদ্দিন খান অভিযোগ করেন, নিয়ম অনুযায়ী প্যানেল পাঠানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি এবং এটি সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ ও স্বজনপ্রীতির ফল। তবে সাবিনা সিদ্দিকা ও সংসদ সদস্য উভয়েই দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ এবং যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়েই এই নিয়োগ হয়েছে। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম এ জামান জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব পাঠানো হয়নি, বরং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের ছোট ভাই দেওয়ান মোহাম্মদ মঈনউদ্দিনকে গত জুন মাসে সাভারের শিমুলিয়া শ্যামা প্রসাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মো. ইয়ার হোসেন। গত মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অ্যাডহক কমিটি গঠনসংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে, যেখানে সভাপতি মনোনয়নের জন্য নির্দিষ্ট পেশাজীবী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের নাম পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও এই পরিপত্রে সংসদ সদস্যরা অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হতে পারবেন কি পারবেন না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন আদালতের রায় ও পরিপত্রের স্পিরিট অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই।