যশোরের ভৈরব নদ পুনরুদ্ধারে ২৭৯ কোটি টাকার খনন প্রকল্প তিন বছর আগে শেষ হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা এখনো ফেরেনি এবং নৌ চলাচলও চালু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কচুরিপানা ও বর্জ্যে ভরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত পরিকল্পনা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং নদীর দখল ও দূষণের কারণে শত শত কোটি টাকার এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে 'জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প' গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিক ব্যয় ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে চূড়ান্তভাবে ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে চৌগাছার তাহেরপুর থেকে অভয়নগরের আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার নদ খননের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে তাহেরপুর থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং বসুন্দিয়া থেকে আফরাঘাট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়। এছাড়া শহরের ভৈরব তীরের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় করা হয় ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
সরেজমিনে যশোর শহরের দড়াটানা, নিমতলা, দাইতলা, রূপদিয়া, বসুন্দিয়া ও আফরাঘাট এলাকায় দেখা গেছে, নদীর বেশিরভাগ অংশে পানিপ্রবাহ নেই। কোথাও পানি স্থির থাকায় সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে, আবার কোথাও কালো পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর অনেক জায়গা পুনরায় পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, ভৈরব নদের ওপর বর্তমানে ৫৪টি অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডির ২৬টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৪টি, বিএডিসির ৩টি, রেলওয়ের ১টি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ১টি স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৪ ফুট থেকে ১২০ ফুটের মধ্যে, অথচ নদীর প্রস্থ ১৫০ থেকে ২৫০ ফুট পর্যন্ত। সংকীর্ণ এসব স্থাপনা পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সেতু পুনর্নির্মাণের চিঠি দিলেও অধিকাংশ স্থাপনা এখনো অপরিবর্তিত। এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বসুন্দিয়া সেতু পুনর্নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আরও তিনটি সেতু নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানান, তিনটি সেতুর জন্য নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে এবং বাকিদের নকশা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা জানান, নদী খনন হলেও উজানের মাথাভাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ দেওয়া হয়নি এবং খননের সময় চিহ্নিত সংকীর্ণ সেতুগুলো অপসারণ করা হয়নি। ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য তসলিমুর রহমান বলেন, নদী আইন অমান্য করে এখনো নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান বলেন, দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে শুধু খননে কোনো লাভ নেই। পাঁচ নদী রক্ষা আন্দোলনের উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন যশোরের সদস্যসচিব আবু সাঈদ মনে করেন, উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য সম্ভব নয়।