ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য দেশটির তরুণ সমাজের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ বর্তমানে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা, শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গত মাসে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে তীব্র জনরোষের মুখে ভারতের শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিযুক্তদের বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দায়িত্বে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নন্দন নিলেকানিকে নিয়োগ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি কেবল পরীক্ষার সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভারতের তরুণদের মূল সংকট হলো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার গভীর ব্যবধান। অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, গত এক দশকে ভারতের শ্রমবাজার আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষির বাইরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, বাস্তব মজুরি স্থবির থাকা এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শ্রমের চাহিদা বাড়ছে না। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে স্নাতকদের একটি বড় অংশ চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুব জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটিরও বেশি। গত দুই দশকে শিক্ষায় ভর্তির হার এবং কারিগরি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে প্রবেশের পথ এখনও অত্যন্ত কঠিন। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬' প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণদের বেকারত্বের হার অন্যান্য বয়সীদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। গত ২৫ বছর ধরে স্নাতকদের বেকারত্বের হার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে স্নাতক ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশ এবং তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালে এই বয়সীদের ২৮ শতাংশ স্নাতক হলেও তাদের ৬৭ শতাংশ কর্মসংস্থান পাননি। এছাড়া ২০০৪-০৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ লাখ নতুন স্নাতক যুক্ত হলেও চাকরি পেয়েছেন মাত্র ২৮ লাখ। স্থায়ী বেতনের চাকরি পেয়েছেন আরও কমসংখ্যক। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হোয়াইট-কলার চাকরি পেয়েছেন এবং ৭ শতাংশেরও কম স্থায়ী বেতনের চাকরিতে যোগ দিতে পেরেছেন।
এই সংকট নিরসনে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, নোটবাতিল ও পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) বাস্তবায়নের পর ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) পুনরুজ্জীবিত করা গেলে কিছু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পনীতি গ্রহণ করা জরুরি। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কর্মসংস্থানের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কৃষির বাইরের ৮ থেকে ১২ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টিমলিজ ডিজিটালের প্রধান নির্বাহী নীতি শর্মার মতে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিয়োগের প্রবৃদ্ধি এখন এক অঙ্কে সীমাবদ্ধ। চুক্তিভিত্তিক চাকরি বাড়ছে, দীর্ঘদিন ধরে বেতন প্রায় স্থির রয়েছে এবং একসময় ভারতীয় মধ্যবিত্তের স্বপ্নের চাকরি হিসেবে পরিচিত জ্ঞানভিত্তিক হোয়াইট-কলার চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি এইচসিএল টেকনোলজিসের এক অনুষ্ঠানে শত শত কর্মীর একযোগে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাটি সেই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষেরই প্রতিফলন। নীতি শর্মা মনে করেন, ভবিষ্যতের কর্মবাজারে শুধু ডিগ্রির চেয়ে কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতার মূল্য বেশি হবে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্ঞানভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের নতুন প্রজন্মকে হয়তো ভবিষ্যতে অফিসভিত্তিক আরামদায়ক চাকরির পরিবর্তে কারিগরি ও দক্ষতানির্ভর পেশার বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। একই সঙ্গে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাও আর সহজ হবে না। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরও যদি তরুণদের আয় ও কর্মসংস্থান স্থবির থাকে, তবে সেটি ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই এখন মোদি সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।