ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী অহেতুক নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার শেরে-বাংলা নগরে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি জাদুঘরের নামফলক উন্মোচন করেন। এ সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, এসব পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে তারা নিজের অজান্তেই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করছে কিনা, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই জাদুঘর কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের রাজনৈতিক প্রচারের স্থান হবে না। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং এর মূল নায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ছিল, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ছিল সেই স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াই।

আহত ও শহীদদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, জুলাইযোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং গুরুতর আহত ৫০ জনকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাইযোদ্ধাকে মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া শহীদদের নামে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নামকরণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

দেশ পুনর্গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের কাজও চলছে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।

ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত দেড় দশকে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হাজারো ছাত্র-জনতা শহীদ এবং কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তিনি শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও পরিবারের প্রতি সমবেদন জানান। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের ঘটনার স্মারক নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস ধারণ করবে। তারেক রহমান বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কখনোই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনকে মেনে নিতে পারেনি। এদেরই পূর্বসূরিগণ ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এইসব ইতিহাস ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই উপকৃত হবে। তিনি বলেন, ইতিহাস বিকৃতি এড়াতে এবং সত্যনিষ্ঠ উপস্থাপনার জন্য জাদুঘরে বিভিন্ন ভাষায় তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এছাড়া ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, জাহেদ উর রহমান ও সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা। এ ছাড়া আন্দোলনে শহীদদের স্বজন ও আহত জুলাইযোদ্ধারা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।