লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রাজিলে লুলার জয়ে লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা

নির্বাচনী জয়েই ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ব্রাজিলের বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ব্রাজিল কোনো দেশের পেছনের উঠান হওয়া মেনে নেবে না। সাধারণত পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে জয়লাভের নজির কম থাকলেও, মার্কিন প্রভাব ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার এই অবস্থান ব্রাজিলীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে। সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে প্রভাবশালী মহল ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে রাজনৈতিক পরিচিতি লুলার রয়েছে, এই কড়া বার্তা তার সঙ্গেই মানানসই।

লুলার এমন প্রতিবাাদী অবস্থান সত্ত্বেও ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন সুর দেখা গেছে। তিনি লুলাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন এবং তাদের সম্পর্ক ভালো বলে মন্তব্য করেন। নির্বাচনে তিনি কারও পক্ষে অবস্থান নেননি দাবি করলেও পরবর্তীতে এই নির্বাচনকে কারচুপিপূর্ণ ও ভয়ানক বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। তবে তিনি প্রকাশ্যে লুলার প্রতিযোগী ফ্লাভিও বলসোনারোকে সমর্থন করেননি। দেশটির নির্বাচনী আদালত কোনো অনিয়ম না পাওয়ার পর ফ্লাভিওর নিজ দল ফলাফল মেনে নিলেও তিনি পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্প ফ্লাভিওর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। উল্লেখ্য, এক বছর আগে জাইর বলসোনারোর অভ্যুত্থান চেষ্টার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্রাজিলের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের পর ট্রাম্প ও লুলার সম্পর্ক চরম অবনতি ঘটেছিল। সেই সময় লুলার কোনো যোগাযোগের ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মার্কিন হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বানে লুলার জনপ্রিয়তায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান ঘটেছিল। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা এবং পেরুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মনোভাবের প্রেসিডেন্টরা ক্ষমতায় আসেন। পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারে ট্রাম্প এই বলয়কে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, যাকে তিনি ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দেন। চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনি জানান, ফ্লাভিওর প্রাথমিক সাফল্যের পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল হবে এই কৌশলে তার দশম এবং সবচেয়ে বড় অর্জিত সাফল্য। একইসঙ্গে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেল সম্পদের মালিক ব্রাজিলের দিকে আমেরিকার বিশেষ নজর ছিল, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ মাদকবিরোধী জোটে যুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল।

তবে লুলার আগামী চার বছরের নতুন মেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার একাধিক কূটনৈতিক কারণ রয়ে গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সংশয় প্রকাশ করায় ব্রাজিল সফররত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। এর জবাবে ওয়াশিংটনও ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে। এছাড়া লাতিন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কঠোর বিরোধী লুলা। ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার চেষ্টা কিংবা মাদকবাহী জাহাজে মার্কিন বোমাবর্ষণের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ফ্লাভিওর সুপারিশে ব্রাজিলের প্রধান দুটি অপরাধী চক্রকে মার্কিন প্রশাসন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় লুলার ক্ষোভ আরও বাড়ে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের দ্বন্দ্বের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের ডিজিটাল তাত্ক্ষণিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘পিক্স’-এর কারণে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে মনে করে ট্রাম্প প্রশাসন অসন্তুষ্ট। প্রচারণাকালে বলসোনারোর সমর্থকরা মার্কিন পতাকা উড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেও, বর্তমানে চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। আগামী দিনে দুই দেশের এই রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা টিকবে, তা নির্ভর করছে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করা এবং লুলার কড়া প্রতিক্রিয়ার ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষোভ

ব্রাজিলে লুলার জয়ে লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৪৬:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

নির্বাচনী জয়েই ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ব্রাজিলের বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ব্রাজিল কোনো দেশের পেছনের উঠান হওয়া মেনে নেবে না। সাধারণত পররাষ্ট্রনীতিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে জয়লাভের নজির কম থাকলেও, মার্কিন প্রভাব ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লুলার এই অবস্থান ব্রাজিলীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে। সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে প্রভাবশালী মহল ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে রাজনৈতিক পরিচিতি লুলার রয়েছে, এই কড়া বার্তা তার সঙ্গেই মানানসই।

লুলার এমন প্রতিবাাদী অবস্থান সত্ত্বেও ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন সুর দেখা গেছে। তিনি লুলাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন এবং তাদের সম্পর্ক ভালো বলে মন্তব্য করেন। নির্বাচনে তিনি কারও পক্ষে অবস্থান নেননি দাবি করলেও পরবর্তীতে এই নির্বাচনকে কারচুপিপূর্ণ ও ভয়ানক বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। তবে তিনি প্রকাশ্যে লুলার প্রতিযোগী ফ্লাভিও বলসোনারোকে সমর্থন করেননি। দেশটির নির্বাচনী আদালত কোনো অনিয়ম না পাওয়ার পর ফ্লাভিওর নিজ দল ফলাফল মেনে নিলেও তিনি পরাজয় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্প ফ্লাভিওর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। উল্লেখ্য, এক বছর আগে জাইর বলসোনারোর অভ্যুত্থান চেষ্টার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্রাজিলের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের পর ট্রাম্প ও লুলার সম্পর্ক চরম অবনতি ঘটেছিল। সেই সময় লুলার কোনো যোগাযোগের ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মার্কিন হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বানে লুলার জনপ্রিয়তায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান ঘটেছিল। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা এবং পেরুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মনোভাবের প্রেসিডেন্টরা ক্ষমতায় আসেন। পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারে ট্রাম্প এই বলয়কে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, যাকে তিনি ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দেন। চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনি জানান, ফ্লাভিওর প্রাথমিক সাফল্যের পর ট্রাম্প ভেবেছিলেন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল হবে এই কৌশলে তার দশম এবং সবচেয়ে বড় অর্জিত সাফল্য। একইসঙ্গে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেল সম্পদের মালিক ব্রাজিলের দিকে আমেরিকার বিশেষ নজর ছিল, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘শিল্ড অব আমেরিকাস’ মাদকবিরোধী জোটে যুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল।

তবে লুলার আগামী চার বছরের নতুন মেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার একাধিক কূটনৈতিক কারণ রয়ে গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সংশয় প্রকাশ করায় ব্রাজিল সফররত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। এর জবাবে ওয়াশিংটনও ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে। এছাড়া লাতিন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কঠোর বিরোধী লুলা। ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার চেষ্টা কিংবা মাদকবাহী জাহাজে মার্কিন বোমাবর্ষণের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ফ্লাভিওর সুপারিশে ব্রাজিলের প্রধান দুটি অপরাধী চক্রকে মার্কিন প্রশাসন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় লুলার ক্ষোভ আরও বাড়ে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের দ্বন্দ্বের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের ডিজিটাল তাত্ক্ষণিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘পিক্স’-এর কারণে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভিসা ও মাস্টারকার্ডের ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে মনে করে ট্রাম্প প্রশাসন অসন্তুষ্ট। প্রচারণাকালে বলসোনারোর সমর্থকরা মার্কিন পতাকা উড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেও, বর্তমানে চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। আগামী দিনে দুই দেশের এই রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা টিকবে, তা নির্ভর করছে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করা এবং লুলার কড়া প্রতিক্রিয়ার ওপর।