লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাস্তা অবরুদ্ধ করায় ২০ টি দোকানদারে চরম ভোগান্তি।

রাস্তা অবরুদ্ধ করায় ২০ টি দোকানদারে চরম ভোগান্তি।

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি :  মোঃ শোহানুর রহমান শাহিন

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রাস্তা বন্ধের অভিযোগ, আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেও চরম দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা। একটি ইটের দেয়াল শুধু একটি পথই বন্ধ করেনি; থমকে দিয়েছে ২০টি দোকানের বেচাকেনা, অনিশ্চিত করেছে বহু পরিবারের জীবিকা।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নিউ মার্কেটের ২০টি দোকানের একমাত্র চলাচলের রাস্তা রাতের আঁধারে ইটের প্রাচীর তুলে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের পর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ওই দোকানগুলোর ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা। তাদের দাবি, পারিবারিক ও আইনি নির্দেশনার মধ্যে পড়ে তারা এখন কার্যত পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। এসব দোকানের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ২০০ মানুষের জীবন-জীবিকাতেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আতিকুর রহমান রাজু ও তার লোকজন ওই দোকানগুলোর একমাত্র সাধারণ যাতায়াতের রাস্তায় ইটের প্রাচীর তুলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতের আঁধারে নির্মিত ওই প্রাচীরের কারণে দোকানগুলোর ভেতরে প্রবেশ ও বাইরে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর থেকেই অনেকটা থমকে গেছে ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক জীবন। দোকান খুলতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে বেচাকেনা। ভেতরে থাকা পণ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি দোকানে চার থেকে পাঁচজন করে কর্মচারী কাজ করেন। ফলে শুধু দোকান মালিক নয়, তাদের ওপর নির্ভরশীল কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদেরও পড়তে হচ্ছে চরম আর্থিক সংকটে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাসুদ বলেন, “রাস্তাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের স্বাভাবিক বেচাকেনা বন্ধ রয়েছে। দোকানের ভেতরে লাখ লাখ টাকার পণ্য পড়ে আছে। প্রতিদিন দোকান বন্ধ থাকার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি বাড়ছে। কর্মচারীদের মজুরি দিতে হচ্ছে, ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে, আবার সংসারের খরচও আছে। এভাবে আর কতদিন চলবে, আমরা জানি না।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু দোকান বন্ধ থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে নতুন নতুন দুশ্চিন্তা। কর্মচারীদের দৈনিক মজুরি, ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি, দোকানভাড়া ও পরিবারের নিত্যদিনের খরচ চালানোর চাপ একদিকে; অন্যদিকে নিয়মিত ক্রেতাদের অন্যত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকলে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্রেতাদের হারিয়ে ফেলার ভয়ও করছেন তারা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এই পরিস্থিতির শুরু থেকেই বাজার বণিক সমিতির নীরব ভূমিকা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, একটি বাজারের ২০টি দোকানের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়ে কার্যকর ভূমিকা কেন দেখা যাচ্ছে না।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা কারও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে যেতে চাই না। বিষয়টি যার যার আইনি বিষয়, সেটি আদালতেই নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে কেন? আমরা তো আমাদের পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।”

ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থার মানসিক চাপও এখন তাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে একজন ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তারা।

এদিকে, ঘটনার পর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আদালত থেকে Status Quo (স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ) দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে।

তবে আদালতের প্রক্রিয়া চললেও জীবিকা থেমে থাকার বাস্তবতা প্রতিদিনই আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষায়, মামলার রায় আসতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু প্রতিদিনের সংসার, কর্মচারীদের মজুরি, ঋণের কিস্তি আর ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই অপেক্ষা করে না।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আদালতের নির্দেশ ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখেই প্রশাসন ও বাজার বণিক সমিতিকে বিষয়টির মানবিক দিক বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবিকার পথ কীভাবে আইনসম্মতভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্যক্তিগত বিরোধের দেয়াল যেন ২০টি দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে; সেই দেয়ালের ওপারে আটকে আছে শুধু পণ্য নয়, কয়েকশ মানুষের জীবিকার স্বপ্নও।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে ভোটের সময় নির্ধারণ করবে ইসি: সচিব

রাস্তা অবরুদ্ধ করায় ২০ টি দোকানদারে চরম ভোগান্তি।

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৩৭:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

রাস্তা অবরুদ্ধ করায় ২০ টি দোকানদারে চরম ভোগান্তি।

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি :  মোঃ শোহানুর রহমান শাহিন

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রাস্তা বন্ধের অভিযোগ, আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেও চরম দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা। একটি ইটের দেয়াল শুধু একটি পথই বন্ধ করেনি; থমকে দিয়েছে ২০টি দোকানের বেচাকেনা, অনিশ্চিত করেছে বহু পরিবারের জীবিকা।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নিউ মার্কেটের ২০টি দোকানের একমাত্র চলাচলের রাস্তা রাতের আঁধারে ইটের প্রাচীর তুলে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের পর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ওই দোকানগুলোর ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা। তাদের দাবি, পারিবারিক ও আইনি নির্দেশনার মধ্যে পড়ে তারা এখন কার্যত পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। এসব দোকানের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ২০০ মানুষের জীবন-জীবিকাতেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আতিকুর রহমান রাজু ও তার লোকজন ওই দোকানগুলোর একমাত্র সাধারণ যাতায়াতের রাস্তায় ইটের প্রাচীর তুলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতের আঁধারে নির্মিত ওই প্রাচীরের কারণে দোকানগুলোর ভেতরে প্রবেশ ও বাইরে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর থেকেই অনেকটা থমকে গেছে ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক জীবন। দোকান খুলতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে বেচাকেনা। ভেতরে থাকা পণ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি দোকানে চার থেকে পাঁচজন করে কর্মচারী কাজ করেন। ফলে শুধু দোকান মালিক নয়, তাদের ওপর নির্ভরশীল কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদেরও পড়তে হচ্ছে চরম আর্থিক সংকটে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মাসুদ বলেন, “রাস্তাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের স্বাভাবিক বেচাকেনা বন্ধ রয়েছে। দোকানের ভেতরে লাখ লাখ টাকার পণ্য পড়ে আছে। প্রতিদিন দোকান বন্ধ থাকার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি বাড়ছে। কর্মচারীদের মজুরি দিতে হচ্ছে, ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে, আবার সংসারের খরচও আছে। এভাবে আর কতদিন চলবে, আমরা জানি না।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু দোকান বন্ধ থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে নতুন নতুন দুশ্চিন্তা। কর্মচারীদের দৈনিক মজুরি, ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি, দোকানভাড়া ও পরিবারের নিত্যদিনের খরচ চালানোর চাপ একদিকে; অন্যদিকে নিয়মিত ক্রেতাদের অন্যত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকলে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্রেতাদের হারিয়ে ফেলার ভয়ও করছেন তারা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এই পরিস্থিতির শুরু থেকেই বাজার বণিক সমিতির নীরব ভূমিকা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, একটি বাজারের ২০টি দোকানের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়ে কার্যকর ভূমিকা কেন দেখা যাচ্ছে না।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা কারও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে যেতে চাই না। বিষয়টি যার যার আইনি বিষয়, সেটি আদালতেই নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে কেন? আমরা তো আমাদের পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।”

ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থার মানসিক চাপও এখন তাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে একজন ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তারা।

এদিকে, ঘটনার পর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আদালত থেকে Status Quo (স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ) দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে।

তবে আদালতের প্রক্রিয়া চললেও জীবিকা থেমে থাকার বাস্তবতা প্রতিদিনই আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষায়, মামলার রায় আসতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু প্রতিদিনের সংসার, কর্মচারীদের মজুরি, ঋণের কিস্তি আর ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই অপেক্ষা করে না।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আদালতের নির্দেশ ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখেই প্রশাসন ও বাজার বণিক সমিতিকে বিষয়টির মানবিক দিক বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবিকার পথ কীভাবে আইনসম্মতভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ব্যক্তিগত বিরোধের দেয়াল যেন ২০টি দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে; সেই দেয়ালের ওপারে আটকে আছে শুধু পণ্য নয়, কয়েকশ মানুষের জীবিকার স্বপ্নও।