লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা বা রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক এই বৈঠকটি বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে আয়োজন করে। গাম্বিয়া ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছিল, যা বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা, বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করা, নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, কেবল বাংলাদেশের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশিত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটলেও ২০১৭ সালের সহিংসতার পর পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে এবং নতুন প্রজন্মের জন্ম হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিলেও দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতি এখন দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃ একীভূত হতে পারে। তবে তিনি মানব পাচার, মাদক পাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কেবল ন্যূনতম জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, এই প্রবণতা চলতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আগের চেয়ে বেশি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম ও চলাচলে বিধিনিষেধের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ‘আরাকান আর্মি’ উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে এখনো প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন শুধুই সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়, বরং প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এই সংকটের অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বি এস জ্যালো, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

১৯৮০-এর দশকেও রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন ঘটেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কোরআনের মর্যাদা ও মুজিজা: যা কেয়ামত পর্যন্ত অটুট থাকবে

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৪:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা বা রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক এই বৈঠকটি বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে আয়োজন করে। গাম্বিয়া ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছিল, যা বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা, বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করা, নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, কেবল বাংলাদেশের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশিত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটলেও ২০১৭ সালের সহিংসতার পর পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে এবং নতুন প্রজন্মের জন্ম হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিলেও দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতি এখন দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃ একীভূত হতে পারে। তবে তিনি মানব পাচার, মাদক পাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কেবল ন্যূনতম জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, এই প্রবণতা চলতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আগের চেয়ে বেশি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম ও চলাচলে বিধিনিষেধের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ‘আরাকান আর্মি’ উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে এখনো প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন শুধুই সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়, বরং প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এই সংকটের অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বি এস জ্যালো, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

১৯৮০-এর দশকেও রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন ঘটেছে।