লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝুঁকিমুক্ত হয়নি সামষ্টিক অর্থনীতি, অর্থ বিভাগের জরুরি সভা ১ নভেম্বর

নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিতে কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এলেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অর্থ বিভাগের মতে, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা আহ্বান করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনু বিভাগের যুগ্ম সচিব মনজুরুল হক এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে, সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ মেয়াদে অর্থবছর চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল অর্থবছর গণ্য করে জুলাই-মার্চ মেয়াদি ৯ মাসের বিভিন্ন সূচকের হিসাব নিয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো আট শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৩২ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশে আটকে আছে, যা আগের দশকের ছয় শতাংশের বেশি গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। সরকার চলতি বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫০ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ জুনে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ খরায় বড় ভূমিকা রাখছে।

আমদানি ব্যয়ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের আমদানিতে ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানি বিল ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৫.১৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই বাড়তি ডলারের চাহিদা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার এবং প্রতিবছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজার নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, আর্থিক খাতের চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছে।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি এখন বেসরকারি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। মে মাসে এই হার ছিল ৪.৯৮ শতাংশ। এর আগে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও এখন তা নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তির আকার সাত কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার এবং নারী দুই কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। আর প্রতিবছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ, প্রতিবছর প্রায় ১৩-১৪ লাখ নতুন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জে রোপা আমন ধান কাটা শুরু, ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের হাসি

ঝুঁকিমুক্ত হয়নি সামষ্টিক অর্থনীতি, অর্থ বিভাগের জরুরি সভা ১ নভেম্বর

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩০:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিতে কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এলেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অর্থ বিভাগের মতে, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার লক্ষ্যে আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা আহ্বান করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অনু বিভাগের যুগ্ম সচিব মনজুরুল হক এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে, সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ মেয়াদে অর্থবছর চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল অর্থবছর গণ্য করে জুলাই-মার্চ মেয়াদি ৯ মাসের বিভিন্ন সূচকের হিসাব নিয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো আট শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৩২ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। এছাড়া গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশে আটকে আছে, যা আগের দশকের ছয় শতাংশের বেশি গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। সরকার চলতি বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫০ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ জুনে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ খরায় বড় ভূমিকা রাখছে।

আমদানি ব্যয়ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের আমদানিতে ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানি বিল ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৫.১৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই বাড়তি ডলারের চাহিদা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার এবং প্রতিবছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজার নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, আর্থিক খাতের চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছে।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি এখন বেসরকারি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে। মে মাসে এই হার ছিল ৪.৯৮ শতাংশ। এর আগে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও এখন তা নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে মোট শ্রমশক্তির আকার সাত কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার এবং নারী দুই কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। আর প্রতিবছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ, প্রতিবছর প্রায় ১৩-১৪ লাখ নতুন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।