লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ বছরে ১৩৭ কোটি টাকা লোকসান বিআইডব্লিউটিসির

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) টানা পাঁচ বছর ধরে বড় অঙ্কের লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি। গত রোববার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সংস্থাটির সার্বিক আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। বিআইডব্লিউটিসির নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ফেরির ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি মূলত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে ১টি সরকারি ও ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬০৮টি নৌযান সমন্বয়ে বিআইডব্লিউটিসি গঠিত হয়েছিল। দেশের মূল ভূখণ্ড, উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল ও আন্তদেশীয় নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনসহ নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ বজায় রাখতে ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করা সংস্থাটির মূল দায়িত্ব। এছাড়া তাদের একটি জাহাজ মেরামত (শিপ রিপেয়ার) সার্ভিস ইউনিটও রয়েছে। একসময় লাভজনক থাকা এ সরকারি প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২১ কোটি টাকা লাভ করেছিল। তবে এর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে আয়ে ভাটা পড়ে।

বিআইডব্লিউটিসির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি ৪৩৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ৪৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় করায় লোকসান হয় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি টাকায় এবং ৪০০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে লোকসান হয় ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ৩৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় হলে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ কোটি ২০ লাখ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ৩১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও ব্যয় ৩৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা হওয়ায় লোকসান হয় ২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের অনিরীক্ষিত হিসাবে আয় হয়েছে ৩২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ৩৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যেখানে লোকসান হয়েছে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

ধারাবাহিক আর্থিক লোকসানের ফলে সরকারের কাছে থাকা বিআইডব্লিউটিসির ৭১৭ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি বা ঋণ পরিশোধের দায় (ডিএসএল) মেটানোর সক্ষমতাও কমে গেছে। প্রতিবছর সংস্থাটিকে ১৫ কোটি টাকা ডিএসএল হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি সার্ভিস বন্ধ হওয়াকে আয়ের বড় উৎস হারানোর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অন্যান্য ফেরি রুটে উল্লেখযোগ্য আয় বজায় রয়েছে। গত পাঁচ বছরে সংস্থাটি মোট ১ কোটি ১৬ লাখের বেশি যানবাহন পারাপার করেছে। এ সময়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট থেকে প্রায় ৮৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, চাঁদপুরে-শরীয়তপুর রুট থেকে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, আরিচা-কাজিরহাট রুট থেকে প্রায় ১৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, লাহারহাট-ভেদুরিয়া রুট থেকে প্রায় ১২৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুট থেকে প্রায় ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা আয় এসেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাটি নতুন রুট চালু ও নৌযান রূপান্তরের পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে এবং সংসদীয় কমিটিতে ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিসির যাত্রীবাহী নৌযান এমভি বাঙালি, এমভি রূপসা, এমভি মধুমতি ও এমভি সুগন্ধাকে ভাসমান হাসপাতালে এবং এমভি সোনারগাঁওকে ভাসমান রেস্তোরাঁয় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চারটি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমারের মধ্যে বর্তমানে কেবল একটি সচল রয়েছে।

এদিকে পদ্মা সেতুর প্রভাবের পাশাপাশি সংস্থাটির লোকসানের পেছনে অতীতে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি যুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিসিসহ অন্যান্য লোকসানি সংস্থার পরিস্থিতি ও ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়নে সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমকে আহ্বায়ক করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এই উপকমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী, ফেরত দিতে ভারতকে অনুরোধ: আইনমন্ত্রী

পাঁচ বছরে ১৩৭ কোটি টাকা লোকসান বিআইডব্লিউটিসির

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৪১:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) টানা পাঁচ বছর ধরে বড় অঙ্কের লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি। গত রোববার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে সংস্থাটির সার্বিক আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। বিআইডব্লিউটিসির নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ফেরির ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি মূলত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে ১টি সরকারি ও ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬০৮টি নৌযান সমন্বয়ে বিআইডব্লিউটিসি গঠিত হয়েছিল। দেশের মূল ভূখণ্ড, উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল ও আন্তদেশীয় নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনসহ নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ বজায় রাখতে ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করা সংস্থাটির মূল দায়িত্ব। এছাড়া তাদের একটি জাহাজ মেরামত (শিপ রিপেয়ার) সার্ভিস ইউনিটও রয়েছে। একসময় লাভজনক থাকা এ সরকারি প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২১ কোটি টাকা লাভ করেছিল। তবে এর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে আয়ে ভাটা পড়ে।

বিআইডব্লিউটিসির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি ৪৩৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ৪৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় করায় লোকসান হয় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি টাকায় এবং ৪০০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে লোকসান হয় ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে ৩৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় হলে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ কোটি ২০ লাখ টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ৩১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও ব্যয় ৩৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা হওয়ায় লোকসান হয় ২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের অনিরীক্ষিত হিসাবে আয় হয়েছে ৩২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ৩৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যেখানে লোকসান হয়েছে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

ধারাবাহিক আর্থিক লোকসানের ফলে সরকারের কাছে থাকা বিআইডব্লিউটিসির ৭১৭ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি বা ঋণ পরিশোধের দায় (ডিএসএল) মেটানোর সক্ষমতাও কমে গেছে। প্রতিবছর সংস্থাটিকে ১৫ কোটি টাকা ডিএসএল হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। পদ্মা সেতু চালুর পর ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি সার্ভিস বন্ধ হওয়াকে আয়ের বড় উৎস হারানোর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অন্যান্য ফেরি রুটে উল্লেখযোগ্য আয় বজায় রয়েছে। গত পাঁচ বছরে সংস্থাটি মোট ১ কোটি ১৬ লাখের বেশি যানবাহন পারাপার করেছে। এ সময়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট থেকে প্রায় ৮৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, চাঁদপুরে-শরীয়তপুর রুট থেকে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, আরিচা-কাজিরহাট রুট থেকে প্রায় ১৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, লাহারহাট-ভেদুরিয়া রুট থেকে প্রায় ১২৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুট থেকে প্রায় ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা আয় এসেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাটি নতুন রুট চালু ও নৌযান রূপান্তরের পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত নতুন ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে এবং সংসদীয় কমিটিতে ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিসির যাত্রীবাহী নৌযান এমভি বাঙালি, এমভি রূপসা, এমভি মধুমতি ও এমভি সুগন্ধাকে ভাসমান হাসপাতালে এবং এমভি সোনারগাঁওকে ভাসমান রেস্তোরাঁয় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চারটি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল স্টিমারের মধ্যে বর্তমানে কেবল একটি সচল রয়েছে।

এদিকে পদ্মা সেতুর প্রভাবের পাশাপাশি সংস্থাটির লোকসানের পেছনে অতীতে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি যুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিসিসহ অন্যান্য লোকসানি সংস্থার পরিস্থিতি ও ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়নে সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমকে আহ্বায়ক করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এই উপকমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেবে।