লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকৃতির গল্প ও হারিয়ে যাওয়া বন্য প্রাণীর দিনলিপি

প্রকৃতির প্রতিটি বদলের পেছনে একটি গল্প থাকে এবং সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান এই গল্পগুলোই খুঁজে ফিরছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা ড. খান ১৯৮৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন চিড়িয়াখানায় এবং ১৯৮৯ সালে দুবাই চিড়িয়াখানার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশে বন্য প্রাণীদের লাল তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে ড. রেজা খান পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার বাদি হাঁসের কথা স্মরণ করেন। ১৯৭৭ সালে ডক্টরেট শেষ করে দেশে ফেরার পর তিনি দেখেন, দেশলাইয়ের কাঠি তৈরির জন্য সিভিট গাছ কেটে ফেলায় হাঁসগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারিয়ে ১০ মিটারের নিচে শিমুল বা ছাতিম গাছে বাসা বাঁধতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ সেই হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে পালা হাঁসের সঙ্গে বাচ্চা ফোটাতেন। কাপ্তাই হ্রদ তৈরির পর খালগুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং সড়ক নির্মাণের ফলে সেই জীবনধারা ও হাঁসের আবাসস্থল আজ হারিয়ে গেছে।

১৯৭৯ সালে টেকনাফে বনকর্মীদের সহায়তায় বন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, বনের পাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এমন অনেক কৌশল শিখেছেন যা কোনো বইয়ে পাওয়া যায় না। হাতির গতিবিধি বোঝার জন্য বাতাসের দিক অনুযায়ী ধুলো উড়িয়ে পরীক্ষা করার কৌশলটি তিনি এক সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই শিখেছিলেন।

ড. রেজা খান আক্ষেপ করে বলেন, প্রকৃতির প্রতি মমতার চেয়ে আমরা মানুষকে সার্টিফিকেটের শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। গ্রামে আগে শিয়াল বা বনবিড়াল মুরগি নিয়ে গেলে মানুষ সহনশীল থাকত, কিন্তু এখন সেই সহনশীলতা কমে গেছে। তিনি মনে করেন, স্কুলগুলোতে কৃষিকাজ ও প্রকৃতির প্রতি মমতা শেখানোর জন্য হাতে-কলমে বাগান করার মতো কর্মসূচি থাকা জরুরি।

নিজের গ্রাম ধামরাইয়ের বালিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় জেলে, কৃষক ও মাঝিদের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে খাটাশ, বেজি ও গন্ধগোকুলের মতো প্রাণী আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া উঁচু গাছ কেটে ফেলায় শকুনও হারিয়ে গেছে, কারণ শকুন কেবল দোল খাওয়া ডালে বসতে পারে। বন উজাড় হওয়ার ফলে মাটির নিচের ছত্রাকের জাল ধ্বংস হচ্ছে, যা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ঝরনা তৈরিতে বাধা দিচ্ছে।

বন্য প্রাণী ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যকে এক সুতায় বাঁধা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য অন্তত ধার চাওয়ার সুযোগ থাকলেও বন্য প্রাণীর সেই উপায় নেই, তাদের কেবল মরে যেতে হয়। দেশে হাতি ছিল ২০০ থেকে ৩০০টি, যা এখনো প্রায় একই আছে, অথচ সংখ্যা বাড়ার কথা ছিল। সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব বনই মানুষের পদচারণায় বদলে গেছে। তিনি পরামর্শ দেন, সরকারের খালি জমিতে দিঘি খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং বন ও নদী রক্ষার কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সানার কাছে সৌদি জোটের বিমান হামলায় নিহত বেড়ে ৩৩

প্রকৃতির গল্প ও হারিয়ে যাওয়া বন্য প্রাণীর দিনলিপি

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩৩:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রকৃতির প্রতিটি বদলের পেছনে একটি গল্প থাকে এবং সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান এই গল্পগুলোই খুঁজে ফিরছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা ড. খান ১৯৮৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন চিড়িয়াখানায় এবং ১৯৮৯ সালে দুবাই চিড়িয়াখানার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশে বন্য প্রাণীদের লাল তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে ড. রেজা খান পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার বাদি হাঁসের কথা স্মরণ করেন। ১৯৭৭ সালে ডক্টরেট শেষ করে দেশে ফেরার পর তিনি দেখেন, দেশলাইয়ের কাঠি তৈরির জন্য সিভিট গাছ কেটে ফেলায় হাঁসগুলো তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারিয়ে ১০ মিটারের নিচে শিমুল বা ছাতিম গাছে বাসা বাঁধতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ সেই হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে পালা হাঁসের সঙ্গে বাচ্চা ফোটাতেন। কাপ্তাই হ্রদ তৈরির পর খালগুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং সড়ক নির্মাণের ফলে সেই জীবনধারা ও হাঁসের আবাসস্থল আজ হারিয়ে গেছে।

১৯৭৯ সালে টেকনাফে বনকর্মীদের সহায়তায় বন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, বনের পাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এমন অনেক কৌশল শিখেছেন যা কোনো বইয়ে পাওয়া যায় না। হাতির গতিবিধি বোঝার জন্য বাতাসের দিক অনুযায়ী ধুলো উড়িয়ে পরীক্ষা করার কৌশলটি তিনি এক সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই শিখেছিলেন।

ড. রেজা খান আক্ষেপ করে বলেন, প্রকৃতির প্রতি মমতার চেয়ে আমরা মানুষকে সার্টিফিকেটের শিক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। গ্রামে আগে শিয়াল বা বনবিড়াল মুরগি নিয়ে গেলে মানুষ সহনশীল থাকত, কিন্তু এখন সেই সহনশীলতা কমে গেছে। তিনি মনে করেন, স্কুলগুলোতে কৃষিকাজ ও প্রকৃতির প্রতি মমতা শেখানোর জন্য হাতে-কলমে বাগান করার মতো কর্মসূচি থাকা জরুরি।

নিজের গ্রাম ধামরাইয়ের বালিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় জেলে, কৃষক ও মাঝিদের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে খাটাশ, বেজি ও গন্ধগোকুলের মতো প্রাণী আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া উঁচু গাছ কেটে ফেলায় শকুনও হারিয়ে গেছে, কারণ শকুন কেবল দোল খাওয়া ডালে বসতে পারে। বন উজাড় হওয়ার ফলে মাটির নিচের ছত্রাকের জাল ধ্বংস হচ্ছে, যা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ঝরনা তৈরিতে বাধা দিচ্ছে।

বন্য প্রাণী ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যকে এক সুতায় বাঁধা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য অন্তত ধার চাওয়ার সুযোগ থাকলেও বন্য প্রাণীর সেই উপায় নেই, তাদের কেবল মরে যেতে হয়। দেশে হাতি ছিল ২০০ থেকে ৩০০টি, যা এখনো প্রায় একই আছে, অথচ সংখ্যা বাড়ার কথা ছিল। সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব বনই মানুষের পদচারণায় বদলে গেছে। তিনি পরামর্শ দেন, সরকারের খালি জমিতে দিঘি খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং বন ও নদী রক্ষার কাজ এখনই শুরু করতে হবে।