লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উৎসবেও জ্বলল না উনুন: কুড়িগ্রামের গোয়াইলপুরীতে ২৫০ পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস, কাটল নদীভাঙন আতঙ্কে

উৎসবেও জ্বলল না উনুন: কুড়িগ্রামের গোয়াইলপুরীতে ২৫০ পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস, কাটল নদীভাঙন আতঙ্কে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

সারাদেশে যখন পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ আর কোরবানির মাংস বিতরণের উৎসবমুখর আমেজ, তখন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের গোয়াইলপুরী চরে বিরাজ করছে এক ভিন্ন ও বিষাদময় চিত্র। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার এই চরের ২৫০টি নিম্নআয়ের পরিবারের কারোর ভাগ্যেই এবার জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস। ঈদ আনন্দের বদলে ভাঙন আর বন্যার আতঙ্ক নিয়েই দিন পার করেছেন এখানকার মানুষ।

বৃহস্পতিবার (ঈদের দিন) সন্ধ্যায় স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেন।

উৎসবের দিনেও কাটেনি ক্ষুধার ক্লান্তি

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বারবার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে নিঃস্ব ও বাস্তুচ্যুত গোয়াইলপুরী এলাকার বাসিন্দারা মূলত দিনমজুর, শ্রমজীবী এবং অত্যন্ত দরিদ্র। ঈদের দিন যখন দেশের কোটি মানুষ কোরবানির মাংসের স্বাদ নিচ্ছেন, তখন এই চরের বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ায়নি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক নেতা কিংবা স্থানীয় প্রশাসন।

বেদনাভরা কণ্ঠে চরের বাসিন্দা আমেনা বেওয়া বলেন:

“হামার এলাকার সগাই খাটি খাওয়া মানুষ। কোরবানি তো দুরের কথা গোশতো কিনি খাওয়ার উপায় নাই। সকাল থাকি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিনু। কাইয়ো এক টুকরো গোশতো দেইল না। এবার আর কোরবানির গোশতোর স্বাদ পাইলোং না।”

মাংসের স্বাদ অধরা, সম্বল শুধু ভাঙন আতঙ্ক

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, “সারাদেশে উৎসবের দিনেও গোয়ালপুরী এলাকার ২৫০ পরিবারের কারো ভাগ্যে এক টুকরো কোরবানির মাংস জোটেনি। সবাই নিম্ন আয়ের খেটেখাওয়া মানুষ। দু-একজন সামর্থ্য অনুযায়ী হাট থেকে ব্রয়লার মুরগি কিনে এনেছেন মাত্র। এর চেয়েও বড় কথা, উৎসবের দিনেও মানুষ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেনি। চোখের সামনে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আতঙ্কে দিন কেটেছে তাদের।”

তিনি আরও জানান, গত এক মাসে এই এলাকার অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পরিবারের বসতভিটা ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে একটি মাদ্রাসাসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে রয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে ইতোমধ্যে ৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভাঙন রোধে দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ না নিলে এই চরের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

জনপ্রতিনিধির বক্তব্য

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “গত বছরগুলোতে এসব চরাঞ্চলে কম-বেশি গরু কোরবানি হলেও, আমার জানা মতে এবারের ঈদে গোয়াইলপুরী এলাকায় কোনো পশু কোরবানি হয়নি। এখানকার অধিকাংশ মানুষ চরম দরিদ্র হওয়ায় তাদের নিজস্ব কোরবানির সামর্থ্য নেই।”

সারাদেশের ঈদের আনন্দ যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছুঁয়ে গেছে, তখন কুড়িগ্রামের এই জনপদের হতদরিদ্র মানুষগুলোর উৎসব কেটেছে কেবলই এক বুক হাহাকার আর নদীভাঙনের অবর্ণনীয় উদ্বেগ নিয়ে।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

হামে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৮৭২ জন

উৎসবেও জ্বলল না উনুন: কুড়িগ্রামের গোয়াইলপুরীতে ২৫০ পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস, কাটল নদীভাঙন আতঙ্কে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৪৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬

উৎসবেও জ্বলল না উনুন: কুড়িগ্রামের গোয়াইলপুরীতে ২৫০ পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস, কাটল নদীভাঙন আতঙ্কে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

সারাদেশে যখন পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ আর কোরবানির মাংস বিতরণের উৎসবমুখর আমেজ, তখন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের গোয়াইলপুরী চরে বিরাজ করছে এক ভিন্ন ও বিষাদময় চিত্র। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার এই চরের ২৫০টি নিম্নআয়ের পরিবারের কারোর ভাগ্যেই এবার জোটেনি এক টুকরো কোরবানির মাংস। ঈদ আনন্দের বদলে ভাঙন আর বন্যার আতঙ্ক নিয়েই দিন পার করেছেন এখানকার মানুষ।

বৃহস্পতিবার (ঈদের দিন) সন্ধ্যায় স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেন।

উৎসবের দিনেও কাটেনি ক্ষুধার ক্লান্তি

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বারবার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে নিঃস্ব ও বাস্তুচ্যুত গোয়াইলপুরী এলাকার বাসিন্দারা মূলত দিনমজুর, শ্রমজীবী এবং অত্যন্ত দরিদ্র। ঈদের দিন যখন দেশের কোটি মানুষ কোরবানির মাংসের স্বাদ নিচ্ছেন, তখন এই চরের বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ায়নি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক নেতা কিংবা স্থানীয় প্রশাসন।

বেদনাভরা কণ্ঠে চরের বাসিন্দা আমেনা বেওয়া বলেন:

“হামার এলাকার সগাই খাটি খাওয়া মানুষ। কোরবানি তো দুরের কথা গোশতো কিনি খাওয়ার উপায় নাই। সকাল থাকি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিনু। কাইয়ো এক টুকরো গোশতো দেইল না। এবার আর কোরবানির গোশতোর স্বাদ পাইলোং না।”

মাংসের স্বাদ অধরা, সম্বল শুধু ভাঙন আতঙ্ক

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, “সারাদেশে উৎসবের দিনেও গোয়ালপুরী এলাকার ২৫০ পরিবারের কারো ভাগ্যে এক টুকরো কোরবানির মাংস জোটেনি। সবাই নিম্ন আয়ের খেটেখাওয়া মানুষ। দু-একজন সামর্থ্য অনুযায়ী হাট থেকে ব্রয়লার মুরগি কিনে এনেছেন মাত্র। এর চেয়েও বড় কথা, উৎসবের দিনেও মানুষ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেনি। চোখের সামনে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আতঙ্কে দিন কেটেছে তাদের।”

তিনি আরও জানান, গত এক মাসে এই এলাকার অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পরিবারের বসতভিটা ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে একটি মাদ্রাসাসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে রয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে ইতোমধ্যে ৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভাঙন রোধে দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ না নিলে এই চরের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

জনপ্রতিনিধির বক্তব্য

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “গত বছরগুলোতে এসব চরাঞ্চলে কম-বেশি গরু কোরবানি হলেও, আমার জানা মতে এবারের ঈদে গোয়াইলপুরী এলাকায় কোনো পশু কোরবানি হয়নি। এখানকার অধিকাংশ মানুষ চরম দরিদ্র হওয়ায় তাদের নিজস্ব কোরবানির সামর্থ্য নেই।”

সারাদেশের ঈদের আনন্দ যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছুঁয়ে গেছে, তখন কুড়িগ্রামের এই জনপদের হতদরিদ্র মানুষগুলোর উৎসব কেটেছে কেবলই এক বুক হাহাকার আর নদীভাঙনের অবর্ণনীয় উদ্বেগ নিয়ে।