লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণের জালে শাহজালাল: পরিত্যক্ত ১২ বিমান সরাতে মরিয়া বেবিচক

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভিলেজের সামনের অ্যাপ্রোন এলাকায় গত ১১ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ১২টি উড়োজাহাজ। একসময়ের আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রতীক হয়ে ওঠা এসব বিমান এখন মরিচা ধরে অকেজো স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে। মূল্যবান এসব উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট অপারেশনাল জায়গা দখল করে রেখেছে। ফলে নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং রপ্তানি পণ্য ওঠানামায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো ও লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ায় জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন ১২টি উড়োজাহাজের বিপরীতে পার্কিং ফি ও চক্রবৃদ্ধি হারে সারচার্জসহ বেবিচকের মোট পাওনা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা রয়েছে। ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি এবং অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের একটি রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে বেবিচক এবং এগুলোর নিবন্ধনও অনেক আগেই বাতিল করা হয়েছে। বারবার চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েও মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিমান সরিয়ে নেয়নি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধকগ্রহীতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।

জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালে এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ২০২০ সালের মার্চে কার্যক্রম বন্ধ করে। আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণের চাপে এসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিগুলোর কর্ণধাররা প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের জায়গা দখল করে রেখেছেন, যার ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে জায়গা খালি করতে ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং ২০২২ সালজুড়ে দেশি-বিদেশি দরপত্র আহ্বান করে নিলামের চেষ্টা চালানো হলেও উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় উড়োজাহাজগুলোর ইঞ্জিন, অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডিং গিয়ারে ব্যাপক ক্ষয় ধরেছে। এগুলোকে পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো মডেলের—ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩ ও বোয়িং ৭৩৭-৩০০, যেগুলোর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী সীমিত। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলার জটিলতায় ক্রেতারাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

এই অবস্থায় গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বেবিচক জানিয়েছে, ক্রেতা না পাওয়া গেলে উড়োজাহাজগুলো ওজনভিত্তিক হিসেবে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প নেই। বেবিচক ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়েছে। বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। সেগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে সেগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।’ বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেবিচকের প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। বিমান বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো সরানো প্রয়োজন, যাতে কার্গো এলাকার সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন নিশ্চিত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় শাহজালালের অ্যাপ্রোনে তৈরি হওয়া এই ‘বিমান কবরস্থান’-এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে ফুলবাড়ী দিবসে ৬ দফা চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি

ঋণের জালে শাহজালাল: পরিত্যক্ত ১২ বিমান সরাতে মরিয়া বেবিচক

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:১৫:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভিলেজের সামনের অ্যাপ্রোন এলাকায় গত ১১ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ১২টি উড়োজাহাজ। একসময়ের আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রতীক হয়ে ওঠা এসব বিমান এখন মরিচা ধরে অকেজো স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে। মূল্যবান এসব উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট অপারেশনাল জায়গা দখল করে রেখেছে। ফলে নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং রপ্তানি পণ্য ওঠানামায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো ও লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ায় জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন ১২টি উড়োজাহাজের বিপরীতে পার্কিং ফি ও চক্রবৃদ্ধি হারে সারচার্জসহ বেবিচকের মোট পাওনা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা রয়েছে। ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি এবং অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের একটি রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করেছে বেবিচক এবং এগুলোর নিবন্ধনও অনেক আগেই বাতিল করা হয়েছে। বারবার চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েও মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিমান সরিয়ে নেয়নি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩০ দিনের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, বন্ধকগ্রহীতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।

জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালে এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ২০২০ সালের মার্চে কার্যক্রম বন্ধ করে। আর্থিক লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও ঋণের চাপে এসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিগুলোর কর্ণধাররা প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের জায়গা দখল করে রেখেছেন, যার ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে জায়গা খালি করতে ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং ২০২২ সালজুড়ে দেশি-বিদেশি দরপত্র আহ্বান করে নিলামের চেষ্টা চালানো হলেও উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় উড়োজাহাজগুলোর ইঞ্জিন, অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম, ককপিটের যন্ত্রপাতি ও ল্যান্ডিং গিয়ারে ব্যাপক ক্ষয় ধরেছে। এগুলোকে পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো মডেলের—ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩ ও বোয়িং ৭৩৭-৩০০, যেগুলোর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী সীমিত। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য পাওনাদারের মামলার জটিলতায় ক্রেতারাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

এই অবস্থায় গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বেবিচক জানিয়েছে, ক্রেতা না পাওয়া গেলে উড়োজাহাজগুলো ওজনভিত্তিক হিসেবে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প নেই। বেবিচক ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন চেয়েছে। বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। সেগুলো ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তোলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে যে ব্যয় হবে, বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বাস্তবে সেগুলো এখন স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে।’ বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেবিচকের প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। বিমান বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো সরানো প্রয়োজন, যাতে কার্গো এলাকার সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন নিশ্চিত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় শাহজালালের অ্যাপ্রোনে তৈরি হওয়া এই ‘বিমান কবরস্থান’-এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।