লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৯ লাখ টাকায় কি মীমের মৃত্যুর বিচার শেষ?

রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মতো কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকা ফুটপাতে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান বাক-প্রতিবন্ধী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম। একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকার ফুটপাতে উঠে তাকে পিষে মারার পর থেকেই এই ঘটনাটি কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বিচারবোধের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রে যেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কথা, সেখানে অর্থের দাপট ও আইনি ফাঁকফোকরের মাধ্যমে ৯ লাখ টাকার ‘আপসনামায়’ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা চলছে। একটি জীবনের মূল্য কি মাত্র ৯ লাখ টাকা? অর্থের বিনিময়ে এমন অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া আমাদের সমাজের জন্য এক বিপজ্জনক বার্তা।

তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর গাড়িটি চালিয়ে ফুটপাতে তুলে দেয় এবং পাশে তাদের নিযুক্ত চালক বসে ছিল। ফুটেজে কিশোরটিকে চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা গেলেও গুলশান থানা পুলিশ মূল এজাহারে সেই কিশোরকে আড়াল করে ৪৪ বছর বয়সী চালক আকাশ মারককে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করে। সুরক্ষিত এলাকার ফুটেজ থাকার পরও একজন ‘প্রক্সি চালক’ দাঁড় করানোর এই নাটক প্রমাণ করে, শুরু থেকেই প্রভাবশালী অপরাধীকে বাঁচানোর প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা ছিল।

তদন্তে চরম গাফিলতির আরেকটি উদাহরণ হলো, লাইসেন্সহীন কিশোর চালকের কোনো ডোপ টেস্ট বা রক্ত পরীক্ষা না করা। সে কি কোনো মাদকের প্রভাবে ছিল বা তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা খতিয়ে দেখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া আদালতের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী নির্লজ্জভাবে দাবি করেছেন, গাড়ি থেকে হর্ন দেওয়া সত্ত্বেও নিহত ব্যক্তি বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ায় সরতে পারেননি। অথচ ফুটপাত মানুষের হাঁটার নিরাপদ জায়গা, গাড়ি চালানোর স্থান নয়। এখানে দৃষ্টি বা বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ার অজুহাত দিয়ে অপরাধকে আড়াল করা যায় না।

এই ট্র্যাজেডি বিত্তশালী অভিভাবকদের নৈতিক দেউলিয়াত্বকেও উন্মোচিত করেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাতে লাইসেন্স ছাড়া বিলাসবহুল ঘাতক গাড়ি তুলে দেওয়া কেবল দায়িত্বহীনতা নয়, এটি একটি সামাজিক অপরাধ। ঘটনার পর অনুশোচনা না দেখিয়ে বিপুল অর্থের থলে নিয়ে আদালতে হাজির হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে আপসনামা তৈরি করে অভিভাবকরা মূলত তাকে ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধ করার লাইসেন্স দিচ্ছেন।

আদালতের সামনে দাফন-কাফনের ১ লাখ এবং মা-বাবার জন্য ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে জামিনে আপত্তি না করার যে আপসনামা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। অত্যন্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো এবং বিচারালয়ে তা সায় পাওয়া বিচারব্যবস্থার ওপর এক তামাশা।

যদি ৯ লাখ টাকায় রাজপথের রক্ত মোছার এই সংস্কৃতি স্থায়ী হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এর অর্থ দাঁড়াবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আর ক্ষমতার হাত থাকলে মানুষকে পিষে মেরে ফেলা কোনো অপরাধ নয়। সংবিধান যেখানে জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে, সেখানে অর্থের জোরে পার পাওয়ার এই প্রবণতা ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে। সিসিটিভি ফুটেজ, লাইসেন্সহীন কিশোরের বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং পুলিশের গাফিলতি প্রমাণ করে এটি একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। বিচারিক ব্যবস্থার মর্যাদা ফেরাতে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সোনারগাঁয়ে মেঘনায় ট্রলারডুবি: একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার

৯ লাখ টাকায় কি মীমের মৃত্যুর বিচার শেষ?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০১:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মতো কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকা ফুটপাতে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান বাক-প্রতিবন্ধী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মীম। একটি বিলাসবহুল প্রাইভেটকার ফুটপাতে উঠে তাকে পিষে মারার পর থেকেই এই ঘটনাটি কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বিচারবোধের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্য ও স্বাধীন রাষ্ট্রে যেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কথা, সেখানে অর্থের দাপট ও আইনি ফাঁকফোকরের মাধ্যমে ৯ লাখ টাকার ‘আপসনামায়’ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা চলছে। একটি জীবনের মূল্য কি মাত্র ৯ লাখ টাকা? অর্থের বিনিময়ে এমন অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া আমাদের সমাজের জন্য এক বিপজ্জনক বার্তা।

তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর গাড়িটি চালিয়ে ফুটপাতে তুলে দেয় এবং পাশে তাদের নিযুক্ত চালক বসে ছিল। ফুটেজে কিশোরটিকে চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা গেলেও গুলশান থানা পুলিশ মূল এজাহারে সেই কিশোরকে আড়াল করে ৪৪ বছর বয়সী চালক আকাশ মারককে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করে। সুরক্ষিত এলাকার ফুটেজ থাকার পরও একজন ‘প্রক্সি চালক’ দাঁড় করানোর এই নাটক প্রমাণ করে, শুরু থেকেই প্রভাবশালী অপরাধীকে বাঁচানোর প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা ছিল।

তদন্তে চরম গাফিলতির আরেকটি উদাহরণ হলো, লাইসেন্সহীন কিশোর চালকের কোনো ডোপ টেস্ট বা রক্ত পরীক্ষা না করা। সে কি কোনো মাদকের প্রভাবে ছিল বা তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা খতিয়ে দেখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া আদালতের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী নির্লজ্জভাবে দাবি করেছেন, গাড়ি থেকে হর্ন দেওয়া সত্ত্বেও নিহত ব্যক্তি বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ায় সরতে পারেননি। অথচ ফুটপাত মানুষের হাঁটার নিরাপদ জায়গা, গাড়ি চালানোর স্থান নয়। এখানে দৃষ্টি বা বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ার অজুহাত দিয়ে অপরাধকে আড়াল করা যায় না।

এই ট্র্যাজেডি বিত্তশালী অভিভাবকদের নৈতিক দেউলিয়াত্বকেও উন্মোচিত করেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের হাতে লাইসেন্স ছাড়া বিলাসবহুল ঘাতক গাড়ি তুলে দেওয়া কেবল দায়িত্বহীনতা নয়, এটি একটি সামাজিক অপরাধ। ঘটনার পর অনুশোচনা না দেখিয়ে বিপুল অর্থের থলে নিয়ে আদালতে হাজির হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটিকে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিজের সন্তানকে বাঁচাতে আপসনামা তৈরি করে অভিভাবকরা মূলত তাকে ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধ করার লাইসেন্স দিচ্ছেন।

আদালতের সামনে দাফন-কাফনের ১ লাখ এবং মা-বাবার জন্য ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে জামিনে আপত্তি না করার যে আপসনামা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। অত্যন্ত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো এবং বিচারালয়ে তা সায় পাওয়া বিচারব্যবস্থার ওপর এক তামাশা।

যদি ৯ লাখ টাকায় রাজপথের রক্ত মোছার এই সংস্কৃতি স্থায়ী হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এর অর্থ দাঁড়াবে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আর ক্ষমতার হাত থাকলে মানুষকে পিষে মেরে ফেলা কোনো অপরাধ নয়। সংবিধান যেখানে জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে, সেখানে অর্থের জোরে পার পাওয়ার এই প্রবণতা ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে। সিসিটিভি ফুটেজ, লাইসেন্সহীন কিশোরের বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং পুলিশের গাফিলতি প্রমাণ করে এটি একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। বিচারিক ব্যবস্থার মর্যাদা ফেরাতে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।