লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকটে যুদ্ধের মাশুল দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল—বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের এই অঞ্চলে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে চরম হিমশিম খাচ্ছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর আগেও এই অঞ্চলের জ্বালানির একটি বড় অংশ আসতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই দেশগুলো চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধকল পোহাতে হচ্ছে দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে নাজুক মানুষদের।

ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির দেশ তাদের ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এই দেশটির প্রধান সরবরাহকারী ছিল ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত। এছাড়া কাতার ছিল তাদের এলএনজির প্রধান উৎস। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন করলেও স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কাতারের এলএনজি এবং পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের ওপর তাদের নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তানও সৌদি আরব, কুয়েত, আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই দুই দেশের বিকল্প জ্বালানি উৎসের সুযোগ ভারতের চেয়েও কম। স্থলবেষ্টিত নেপাল সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল আমদানি না করলেও তারা পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজিসহ প্রায় সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে নেপালেও তার দ্রুত প্রভাব পড়ে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের মুখে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা আসমা বেগম জানান, তিনি মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করেন। দুই সন্তানের এই জননী আরও উপার্জনের চেষ্টা করলেও এখন কাজ পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। আসমা বলেন, ‘ধনীরাও এখন আর্থিক চাপের মুখে। তারা কোনো গৃহকর্মী না রেখেই নিজেরাই ঘরের কাজ সামলানোর চেষ্টা করছেন।’ এই বাড়তি খরচের চাপ এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। আসমার বাবা ও ভাই বরিশালের উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আর তার ক্যানসার আক্রান্ত মা একটি মেসে রান্নার কাজ করে কোনোমতে টিকে আছেন।

একই ধরনের দুঃখজনক চিত্র দেখা গেছে পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানকার বিত্তশালী এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা সাজিদা জিবরান জানান, তার অসুস্থ স্বামী এখন আর কাজ করতে পারেন না এবং তার তিন সন্তান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করছে। গত বছরের শেষে তাদের যে বাড়িভাড়া ছিল ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি, তা গত মাসে বেড়ে ২৫ হাজার রুপিতে দাঁড়িয়েছে। সাজিদা বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সবাই মোটামুটি ভালোভাবেই খাওয়া-দাওয়া করতে পারত। আমি মাংস বা মুরগি কিনতে পারতাম; কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর শাকসবজির দামও এতটাই বেড়ে গেছে যে সেগুলো কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ এছাড়া আগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসত ১ হাজার ৫০০ রুপি, এখন তা শুরুই হয় ৫ হাজার রুপি থেকে। গ্যাসের বিলও কমপক্ষে ২ হাজার রুপি আসছে, যার ফলে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হোয়াইট হাউসে সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যম নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প

জ্বালানি সংকটে যুদ্ধের মাশুল দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৩৭:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল—বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের এই অঞ্চলে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে চরম হিমশিম খাচ্ছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর আগেও এই অঞ্চলের জ্বালানির একটি বড় অংশ আসতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই দেশগুলো চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধকল পোহাতে হচ্ছে দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে নাজুক মানুষদের।

ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির দেশ তাদের ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে থাকে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এই দেশটির প্রধান সরবরাহকারী ছিল ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত। এছাড়া কাতার ছিল তাদের এলএনজির প্রধান উৎস। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন করলেও স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কাতারের এলএনজি এবং পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামের ওপর তাদের নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তানও সৌদি আরব, কুয়েত, আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই দুই দেশের বিকল্প জ্বালানি উৎসের সুযোগ ভারতের চেয়েও কম। স্থলবেষ্টিত নেপাল সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল আমদানি না করলেও তারা পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজিসহ প্রায় সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে নেপালেও তার দ্রুত প্রভাব পড়ে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের মুখে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা আসমা বেগম জানান, তিনি মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করেন। দুই সন্তানের এই জননী আরও উপার্জনের চেষ্টা করলেও এখন কাজ পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। আসমা বলেন, ‘ধনীরাও এখন আর্থিক চাপের মুখে। তারা কোনো গৃহকর্মী না রেখেই নিজেরাই ঘরের কাজ সামলানোর চেষ্টা করছেন।’ এই বাড়তি খরচের চাপ এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। আসমার বাবা ও ভাই বরিশালের উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আর তার ক্যানসার আক্রান্ত মা একটি মেসে রান্নার কাজ করে কোনোমতে টিকে আছেন।

একই ধরনের দুঃখজনক চিত্র দেখা গেছে পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানকার বিত্তশালী এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা সাজিদা জিবরান জানান, তার অসুস্থ স্বামী এখন আর কাজ করতে পারেন না এবং তার তিন সন্তান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করছে। গত বছরের শেষে তাদের যে বাড়িভাড়া ছিল ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি, তা গত মাসে বেড়ে ২৫ হাজার রুপিতে দাঁড়িয়েছে। সাজিদা বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সবাই মোটামুটি ভালোভাবেই খাওয়া-দাওয়া করতে পারত। আমি মাংস বা মুরগি কিনতে পারতাম; কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর শাকসবজির দামও এতটাই বেড়ে গেছে যে সেগুলো কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’ এছাড়া আগে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসত ১ হাজার ৫০০ রুপি, এখন তা শুরুই হয় ৫ হাজার রুপি থেকে। গ্যাসের বিলও কমপক্ষে ২ হাজার রুপি আসছে, যার ফলে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।