লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতভাগ পাসের কৃত্রিম রেকর্ড: পরীক্ষা দিতে পারেনি শত শত শিক্ষার্থী

এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাস ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি দেখিয়ে দেশের নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে এই চোখধাঁধানো ফলাফলের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন চিত্র। শতভাগ পাসের হার ধরে রাখার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জন্য কয়েকটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ও ফরম পূরণকারী পরীক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। শতভাগ পাসের এই ধারা প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫, ২০২২, ২০১৭ ও ২০১৫ সালেও বজায় রেখেছিল। তবে এর পেছনে রয়েছে অন্য গল্প। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্কুলটিতে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল ৬১৬ জন, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ, ২৩৪ জন শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বোর্ড ফলাফলে শীর্ষস্থান দখল করে আসছে।

একইভাবে মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৪৯৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৪৮৮ জন পাস করেছে, যার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন। পাসের হার ৯৯.৬৭ শতাংশ। তবে মাইলস্টোনের দিয়াবাড়ী শাখায় নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ১ হাজার ৯৯১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৪৪০ জন; অর্থাৎ ৫৫১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেনি। আবার মোহাম্মদপুর শাখায় ২০৪ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ১৩৪ জন, আর বঞ্চিত হয়েছে ৭০ জন শিক্ষার্থী।

অন্যান্য নামি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত ২ হাজার ১৩৪ জনের মধ্যে ২ হাজার ৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও ৭০ জন বঞ্চিত হয়েছে। মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত ৩ হাজার ৪৯০ জনের বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ৩ হাজার ৩৫৯ জন, যেখানে ১৩১ জন পরীক্ষা দিতে পারেনি। এছাড়া মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ২ হাজার ৭৭০ জন, যার মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন।

এই অভিযোগের বিষয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, প্রথম দফার টেস্ট পরীক্ষায় তারা এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করেছিল। অভিভাবকদের অনুরোধে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নেওয়া হলেও অনেকেই নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় ফরম পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল জানান, নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সঠিক তথ্য তার জানা নেই। তবে তিনি মন্তব্য করেন, শতভাগ পাস দেখানোর জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে নবম শ্রেণির নিবন্ধন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা জরুরি। ভালো ফলাফলের আড়ালে বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে, যা কোচিং, বিশেষ ক্লাস ও পরিবহণ ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা ঠিক নয়, এটি শিক্ষার্থীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন, শতভাগ পাসের হার দেখানোর জন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। অতীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অতীতে যারা এ ধরনের অনিয়ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

নরসিংদী নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২৩৪ ও মাইলস্টোনে ৬২১ জন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি * শতভাগ পাশের হার দেখানোর জন্য এক শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে -চেয়ারম্যান, ঢাকা বোর্ড

জনপ্রিয় সংবাদ

নামফলকে নিজের নাম দেখে ভবন উদ্বোধন না করেই ফিরলেন এমপি হাসনাত

শতভাগ পাসের কৃত্রিম রেকর্ড: পরীক্ষা দিতে পারেনি শত শত শিক্ষার্থী

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:১৫:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাস ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি দেখিয়ে দেশের নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে এই চোখধাঁধানো ফলাফলের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন চিত্র। শতভাগ পাসের হার ধরে রাখার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জন্য কয়েকটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ও ফরম পূরণকারী পরীক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। শতভাগ পাসের এই ধারা প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫, ২০২২, ২০১৭ ও ২০১৫ সালেও বজায় রেখেছিল। তবে এর পেছনে রয়েছে অন্য গল্প। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্কুলটিতে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল ৬১৬ জন, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ, ২৩৪ জন শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বোর্ড ফলাফলে শীর্ষস্থান দখল করে আসছে।

একইভাবে মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৪৯৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৪৮৮ জন পাস করেছে, যার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন। পাসের হার ৯৯.৬৭ শতাংশ। তবে মাইলস্টোনের দিয়াবাড়ী শাখায় নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ১ হাজার ৯৯১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৪৪০ জন; অর্থাৎ ৫৫১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেনি। আবার মোহাম্মদপুর শাখায় ২০৪ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ১৩৪ জন, আর বঞ্চিত হয়েছে ৭০ জন শিক্ষার্থী।

অন্যান্য নামি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত ২ হাজার ১৩৪ জনের মধ্যে ২ হাজার ৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও ৭০ জন বঞ্চিত হয়েছে। মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত ৩ হাজার ৪৯০ জনের বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ৩ হাজার ৩৫৯ জন, যেখানে ১৩১ জন পরীক্ষা দিতে পারেনি। এছাড়া মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ২ হাজার ৭৭০ জন, যার মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন।

এই অভিযোগের বিষয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, প্রথম দফার টেস্ট পরীক্ষায় তারা এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করেছিল। অভিভাবকদের অনুরোধে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নেওয়া হলেও অনেকেই নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় ফরম পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল জানান, নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সঠিক তথ্য তার জানা নেই। তবে তিনি মন্তব্য করেন, শতভাগ পাস দেখানোর জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে নবম শ্রেণির নিবন্ধন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা জরুরি। ভালো ফলাফলের আড়ালে বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে, যা কোচিং, বিশেষ ক্লাস ও পরিবহণ ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা ঠিক নয়, এটি শিক্ষার্থীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন, শতভাগ পাসের হার দেখানোর জন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। অতীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অতীতে যারা এ ধরনের অনিয়ম করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

নরসিংদী নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২৩৪ ও মাইলস্টোনে ৬২১ জন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি * শতভাগ পাশের হার দেখানোর জন্য এক শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে -চেয়ারম্যান, ঢাকা বোর্ড