লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোহিত সাগরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট: কার্যকারিতা ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দেয়ার দৃঢ় প্রচেষ্টা হিসেবে ৫০টি দেশকে নিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও সমর্থক দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, বাংলাদেশ, মিশর, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, সোমালিয়া, জিবুতি, সুদান, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া। সংখ্যার বিচারে এটি একটি বড় জোট হলেও, কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাকে কার্যকর সামরিক সক্ষমতায় রূপ দিতে এই উদ্যোগকে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রকল্পটি রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি মহড়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা হয়তো শেষ পর্যন্ত সীমিত পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং মাঝে মধ্যে যৌথ বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

বর্তমানে লোহিত সাগরের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ কোনো প্রচলিত নৌযুদ্ধ নয়, বরং ইয়েমেনের উপকূল থেকে আসা হুতি আন্দোলনের হুমকি। হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে রয়েছে হোদেইদা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে যাওয়া সামুদ্রিক পথ। জাহাজবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনবোট এবং আকাশপথের ড্রোন ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতিরা ইতিমধ্যে প্রদর্শন করেছে। বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট টোল আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই মডেলটি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চর্চার অনুকরণ এবং এতে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির পরামর্শমূলক সহায়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই জোটে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অংশগ্রহণ মূলত কূটনৈতিক বৈধতার আবরণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীকী ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। তবে যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় এই সরকারের প্রকৃত অবদান অত্যন্ত সীমিত। হুতি হুমকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোহিত সাগরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরই স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং এডেন উপসাগরের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ। বাব আল-মান্দেবের বিপরীত উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো কিংবা হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের উপকূলীয় ঘাঁটিগুলোর ওপরও তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। ফলে হুতিদের হামলা কিংবা তাদের টোল আদায়ের ব্যবস্থাকে প্রতিহত বা বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে এই সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা বাস্তবতার ভুল পাঠ ছাড়া আর কিছু নয়।

সোমালিয়ার অংশগ্রহণকেও একইভাবে বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। যদিও দেশটি এই জোটের স্বাক্ষরকারী, তবে তাদের উপকূল মূলত এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরমুখী এবং লোহিত সাগরের কেন্দ্রীয় অংশের সঙ্গে এর সরাসরি ভৌগোলিক সম্পর্ক নেই। মোগাদিশু থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দূরত্ব প্রায় এক হাজার মাইল। জলদস্যুতা বা অবৈধ মাছ ধরা মোকাবিলায় সোমালিয়ার স্বার্থ থাকলেও, ইরান-সমর্থিত নির্ভুল হামলার বিরুদ্ধে লোহিত সাগরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সোমালিয়াকে সামনের সারির শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত।

জোটের গঠন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতির দিকও তুলে ধরে। বাব আল-মান্দেবের পশ্চিম তীরে অবস্থিত আফ্রিকার যে দেশটি সরাসরি এই প্রণালির বিপরীতে অবস্থান করছে, তারা জোটে নেই। একইভাবে অনুপস্থিত রয়েছে সেই উপসাগরীয় দেশটি, যারা সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের উপকূল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বন্দর নিরাপত্তা, স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনায় সবচেয়ে ব্যাপক বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই দেশটির দক্ষতা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সম্পদ এই কাঠামোকে বাস্তব কার্যকারিতা দিতে পারত।

মিশরের অবস্থান পরিবর্তন এই উদ্যোগের পেছনে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চিত্র আরও স্পষ্ট করে। জোট গঠনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মিশর ও ইরিত্রিয়া এমন একটি নীতির প্রচার করছিল যে, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা কেবল উপকূলীয় দেশগুলোর একচেটিয়া বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু এখন মিশর সেই অবস্থান ত্যাগ করে এমন একটি কাঠামোয় যোগ দিয়েছে, যেখানে তুরস্ক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো লোহিত সাগরে উপকূল নেই এমন দেশও রয়েছে। ইরিত্রিয়াকে বাইরে রেখে মিশরের এই জোটে যোগদান মূলত সৌদির সঙ্গে নীতিগত ঐকমত্যের চেয়ে বরং নিজের প্রভাব কমে যাওয়া ঠেকানোর একটি প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ।

একই জলসীমায় অতীতের বহুপাক্ষিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোও খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ দেয় না। ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স ১৫৩ তথ্য আদান-প্রদান ও নৌ-কূটনীতির ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি করলেও, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলা বাড়তে বাধা দিতে পারেনি। হুতিরা জানে যে, নৌ জোটগুলো ধীরগতিতে কাজ করে এবং সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সীমারেখার কারণে তাদের হাত-পা বাঁধা থাকে। এদিকে, সমুদ্রসীমা ও লোহিত সাগরের দ্বীপাঞ্চল নিয়ে নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইথিওপিয়া এখন সামুদ্রিক ব্যবস্থার একজন সরাসরি অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

মূল বিষয় হলো, লোহিত সাগরে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে অবিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর যেসব দেশের বাণিজ্য, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নির্ভরশীল, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন থাকতে হবে। দূরের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিকে বাদ দেয়া জোটটির বৈধতা ও স্থানীয় মালিকানার ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়। ফলে এই জোটের পরিণতি হঠাৎ ধসে পড়া নয়, বরং ধীরে ধীরে গুরুত্ব ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান এবং সমন্বয়ের জটিলতার কারণে সদস্য দেশগুলো কূটনৈতিক দায় এড়াতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই অবদান রাখবে। বর্তমান কাঠামোয় এই জোট আসলে সমুদ্রে চলমান নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান নয়, বরং সৌদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর।

জনপ্রিয় সংবাদ

খুলনায় দুর্বৃত্তের গুলিতে গৃহবধূ আহত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

লোহিত সাগরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট: কার্যকারিতা ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:০২:৫৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দেয়ার দৃঢ় প্রচেষ্টা হিসেবে ৫০টি দেশকে নিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও সমর্থক দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, বাংলাদেশ, মিশর, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, সোমালিয়া, জিবুতি, সুদান, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া। সংখ্যার বিচারে এটি একটি বড় জোট হলেও, কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাকে কার্যকর সামরিক সক্ষমতায় রূপ দিতে এই উদ্যোগকে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রকল্পটি রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি মহড়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা হয়তো শেষ পর্যন্ত সীমিত পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং মাঝে মধ্যে যৌথ বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

বর্তমানে লোহিত সাগরের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ কোনো প্রচলিত নৌযুদ্ধ নয়, বরং ইয়েমেনের উপকূল থেকে আসা হুতি আন্দোলনের হুমকি। হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে রয়েছে হোদেইদা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে যাওয়া সামুদ্রিক পথ। জাহাজবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনবোট এবং আকাশপথের ড্রোন ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতিরা ইতিমধ্যে প্রদর্শন করেছে। বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট টোল আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই মডেলটি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চর্চার অনুকরণ এবং এতে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির পরামর্শমূলক সহায়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই জোটে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অংশগ্রহণ মূলত কূটনৈতিক বৈধতার আবরণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীকী ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। তবে যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় এই সরকারের প্রকৃত অবদান অত্যন্ত সীমিত। হুতি হুমকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোহিত সাগরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরই স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং এডেন উপসাগরের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ। বাব আল-মান্দেবের বিপরীত উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো কিংবা হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের উপকূলীয় ঘাঁটিগুলোর ওপরও তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। ফলে হুতিদের হামলা কিংবা তাদের টোল আদায়ের ব্যবস্থাকে প্রতিহত বা বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে এই সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা বাস্তবতার ভুল পাঠ ছাড়া আর কিছু নয়।

সোমালিয়ার অংশগ্রহণকেও একইভাবে বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। যদিও দেশটি এই জোটের স্বাক্ষরকারী, তবে তাদের উপকূল মূলত এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরমুখী এবং লোহিত সাগরের কেন্দ্রীয় অংশের সঙ্গে এর সরাসরি ভৌগোলিক সম্পর্ক নেই। মোগাদিশু থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দূরত্ব প্রায় এক হাজার মাইল। জলদস্যুতা বা অবৈধ মাছ ধরা মোকাবিলায় সোমালিয়ার স্বার্থ থাকলেও, ইরান-সমর্থিত নির্ভুল হামলার বিরুদ্ধে লোহিত সাগরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সোমালিয়াকে সামনের সারির শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার তুলনায় অতিরঞ্জিত।

জোটের গঠন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিতির দিকও তুলে ধরে। বাব আল-মান্দেবের পশ্চিম তীরে অবস্থিত আফ্রিকার যে দেশটি সরাসরি এই প্রণালির বিপরীতে অবস্থান করছে, তারা জোটে নেই। একইভাবে অনুপস্থিত রয়েছে সেই উপসাগরীয় দেশটি, যারা সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের উপকূল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বন্দর নিরাপত্তা, স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং চোরাচালানবিরোধী অভিযান পরিচালনায় সবচেয়ে ব্যাপক বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এই দেশটির দক্ষতা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সম্পদ এই কাঠামোকে বাস্তব কার্যকারিতা দিতে পারত।

মিশরের অবস্থান পরিবর্তন এই উদ্যোগের পেছনে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চিত্র আরও স্পষ্ট করে। জোট গঠনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে মিশর ও ইরিত্রিয়া এমন একটি নীতির প্রচার করছিল যে, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা কেবল উপকূলীয় দেশগুলোর একচেটিয়া বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু এখন মিশর সেই অবস্থান ত্যাগ করে এমন একটি কাঠামোয় যোগ দিয়েছে, যেখানে তুরস্ক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো লোহিত সাগরে উপকূল নেই এমন দেশও রয়েছে। ইরিত্রিয়াকে বাইরে রেখে মিশরের এই জোটে যোগদান মূলত সৌদির সঙ্গে নীতিগত ঐকমত্যের চেয়ে বরং নিজের প্রভাব কমে যাওয়া ঠেকানোর একটি প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ।

একই জলসীমায় অতীতের বহুপাক্ষিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোও খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ দেয় না। ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় কম্বাইন্ড টাস্ক ফোর্স ১৫৩ তথ্য আদান-প্রদান ও নৌ-কূটনীতির ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি করলেও, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলা বাড়তে বাধা দিতে পারেনি। হুতিরা জানে যে, নৌ জোটগুলো ধীরগতিতে কাজ করে এবং সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সীমারেখার কারণে তাদের হাত-পা বাঁধা থাকে। এদিকে, সমুদ্রসীমা ও লোহিত সাগরের দ্বীপাঞ্চল নিয়ে নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইথিওপিয়া এখন সামুদ্রিক ব্যবস্থার একজন সরাসরি অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

মূল বিষয় হলো, লোহিত সাগরে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে অবিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর যেসব দেশের বাণিজ্য, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নির্ভরশীল, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন থাকতে হবে। দূরের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিকে বাদ দেয়া জোটটির বৈধতা ও স্থানীয় মালিকানার ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়। ফলে এই জোটের পরিণতি হঠাৎ ধসে পড়া নয়, বরং ধীরে ধীরে গুরুত্ব ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান এবং সমন্বয়ের জটিলতার কারণে সদস্য দেশগুলো কূটনৈতিক দায় এড়াতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই অবদান রাখবে। বর্তমান কাঠামোয় এই জোট আসলে সমুদ্রে চলমান নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান নয়, বরং সৌদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর।