লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসএসসিতে ১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার, অকৃতকার্য ৫ লাখের বেশি

দীর্ঘদিন উচ্চ পাসের হারের ধারাবাহিকতার পর টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিম্নমুখী দেখা যাচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দেখা গেছে, এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার যেমন কমেছে, তেমনি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন, এবার তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতের মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের দুর্বলতা সার্বিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কুমিল্লা ছাড়া বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল গত বছরের প্রায় ৮৮ শতাংশ থেকে কমে ৭৮ শতাংশের কিছু বেশিতে নেমে এসেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করার কারণেই মূলত পাসের হার কমেছে।

মানবিক বিভাগের দুর্বল ফলাফলও সামগ্রিক পাসের হার কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় এ বিভাগে পাসের হার অনেক কম। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি হওয়ায় এ বিভাগের তুলনামূলক কম পাসের হার সার্বিক ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

এবারের পরীক্ষায় ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যা গত বছরের ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি। পাসের হার ও জিপিএ-৫—উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, আর ছাত্রদের প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি এবং ছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি।

এসএসসির পাসের হারে গত দুই দশকে বড় ওঠানামা হয়েছে। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে। এরপর দু-এক বছর বাদে দীর্ঘ সময় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল; কোনো কোনো বছর তা ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার তা আরও কমে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন।

গত তিন যুগে এসএসসির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতি চালুর সময় থেকে ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। পরে প্রশ্নব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আবার পাসের হার তুলনামূলকভাবে কমে আসে। ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টানা দুই বছর ফলাফল নিম্নমুখী হওয়ার পেছনে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে শিখনঘাটতির বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা বিদ্যালয়ে শিখন মান ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে এবারের ফলাফলকে খারাপ বলতে রাজি নন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে এবং পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ অবৈধ ও ব্যর্থ: চাক শুমার

এসএসসিতে ১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার, অকৃতকার্য ৫ লাখের বেশি

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৩:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

দীর্ঘদিন উচ্চ পাসের হারের ধারাবাহিকতার পর টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিম্নমুখী দেখা যাচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে দেখা গেছে, এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার যেমন কমেছে, তেমনি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন, এবার তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতের মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের দুর্বলতা সার্বিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কুমিল্লা ছাড়া বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল গত বছরের প্রায় ৮৮ শতাংশ থেকে কমে ৭৮ শতাংশের কিছু বেশিতে নেমে এসেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করার কারণেই মূলত পাসের হার কমেছে।

মানবিক বিভাগের দুর্বল ফলাফলও সামগ্রিক পাসের হার কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় এ বিভাগে পাসের হার অনেক কম। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি হওয়ায় এ বিভাগের তুলনামূলক কম পাসের হার সার্বিক ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

এবারের পরীক্ষায় ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যা গত বছরের ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি। পাসের হার ও জিপিএ-৫—উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, আর ছাত্রদের প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি এবং ছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি।

এসএসসির পাসের হারে গত দুই দশকে বড় ওঠানামা হয়েছে। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে। এরপর দু-এক বছর বাদে দীর্ঘ সময় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল; কোনো কোনো বছর তা ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার তা আরও কমে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন।

গত তিন যুগে এসএসসির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন পদ্ধতি চালুর সময় থেকে ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। পরে প্রশ্নব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আবার পাসের হার তুলনামূলকভাবে কমে আসে। ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টানা দুই বছর ফলাফল নিম্নমুখী হওয়ার পেছনে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে শিখনঘাটতির বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা বিদ্যালয়ে শিখন মান ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে এবারের ফলাফলকে খারাপ বলতে রাজি নন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে এবং পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকে। একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।