লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, প্রয়োজন যুক্তি ও শালীনতার রাজনীতি

বাংলাদেশে রাজনীতিতে যুক্তির চেয়ে গালাগালি এবং প্রতিপক্ষকে অপমানের প্রবণতা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের কণ্ঠকে ক্ষীণ করে তুলছে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব ও ব্যক্তিগত আক্রমণ দিন দিন মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা, জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের উন্নয়নই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। মতপার্থক্য যখন যুক্তির বদলে গালাগালি, সমালোচনার বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং প্রতিযোগিতার বদলে বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক শক্তি হারায়।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের গণআন্দোলনের মতো প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি মর্যাদাপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন। মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, চেয়েছে অধিকার ও ন্যায়বিচার। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনীতির ভাষা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, যেখানে নিজের নীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেয়ে প্রতিপক্ষকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করাকেই সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। বক্তব্যের যুক্তির ঘাটতি ঢাকতেই অনেকে আক্রমণাত্মক ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ক্ষতিকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, প্রতিপক্ষকে যে যত বেশি আক্রমণ করতে পারেন, তিনি তত বেশি শক্তিশালী। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, বরং জনকল্যাণমূলক সমাধানের গভীরতায় নিহিত। নেতাদের এই আক্রমণাত্মক ভাষা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে না, বরং দলের কর্মীদের আচরণকেও প্রভাবিত করছে, যা সামগ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে, যারা এই সংস্কৃতির কারণে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক, তবে তা হওয়া উচিত নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু বড় অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, সুশাসন এবং জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য। গালাগালির রাজনীতি এই ঐকমত্যের পরিবেশকেই ধ্বংস করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক কুৎসা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর পথ সহজ করেছে, যা কেবল আইন দিয়ে নয়, নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে কঠোর বার্তা দিতে হবে। অশালীন বক্তব্যকে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি না বানিয়ে রাজনৈতিক অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সংসদ ও গণমাধ্যমকে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ভুল স্বীকার করার সাহস এবং প্রতিপক্ষের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার উদারতা থাকা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের মনে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। এটি কেবল সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক আচরণের পরিবর্তন। ইতিহাস কোনো নেতাকে প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়ার জন্য মনে রাখে না, বরং তাঁর নীতি, দূরদৃষ্টি ও অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। তাই বাংলাদেশকে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গালাগালির পথ পরিহার করে যুক্তি, বিবেক ও সহনশীলতার রাজনীতিতে ফিরতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করল অ্যামচেমের প্রতিনিধিদল

ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, প্রয়োজন যুক্তি ও শালীনতার রাজনীতি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৪৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে রাজনীতিতে যুক্তির চেয়ে গালাগালি এবং প্রতিপক্ষকে অপমানের প্রবণতা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের কণ্ঠকে ক্ষীণ করে তুলছে। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব ও ব্যক্তিগত আক্রমণ দিন দিন মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা, জনকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের উন্নয়নই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। মতপার্থক্য যখন যুক্তির বদলে গালাগালি, সমালোচনার বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং প্রতিযোগিতার বদলে বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক শক্তি হারায়।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের গণআন্দোলনের মতো প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি মর্যাদাপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন। মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, চেয়েছে অধিকার ও ন্যায়বিচার। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনীতির ভাষা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, যেখানে নিজের নীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেয়ে প্রতিপক্ষকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করাকেই সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। বক্তব্যের যুক্তির ঘাটতি ঢাকতেই অনেকে আক্রমণাত্মক ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ক্ষতিকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, প্রতিপক্ষকে যে যত বেশি আক্রমণ করতে পারেন, তিনি তত বেশি শক্তিশালী। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, বরং জনকল্যাণমূলক সমাধানের গভীরতায় নিহিত। নেতাদের এই আক্রমণাত্মক ভাষা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে না, বরং দলের কর্মীদের আচরণকেও প্রভাবিত করছে, যা সামগ্রিক সামাজিক শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে, যারা এই সংস্কৃতির কারণে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক, তবে তা হওয়া উচিত নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু বড় অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, সুশাসন এবং জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য। গালাগালির রাজনীতি এই ঐকমত্যের পরিবেশকেই ধ্বংস করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক কুৎসা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর পথ সহজ করেছে, যা কেবল আইন দিয়ে নয়, নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ববোধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে কঠোর বার্তা দিতে হবে। অশালীন বক্তব্যকে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি না বানিয়ে রাজনৈতিক অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সংসদ ও গণমাধ্যমকে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ভুল স্বীকার করার সাহস এবং প্রতিপক্ষের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার উদারতা থাকা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের মনে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। এটি কেবল সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক আচরণের পরিবর্তন। ইতিহাস কোনো নেতাকে প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়ার জন্য মনে রাখে না, বরং তাঁর নীতি, দূরদৃষ্টি ও অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। তাই বাংলাদেশকে একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গালাগালির পথ পরিহার করে যুক্তি, বিবেক ও সহনশীলতার রাজনীতিতে ফিরতে হবে।