লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় অ্যাকাউন্টের ভুয়া তথ্য যেভাবে ছড়াল নেতানিয়াহুর ভাষণে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভুয়া তথ্য কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তার এক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি বেনামি ভারতীয় এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো মনগড়া দাবি মুহূর্তের মধ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের কাছে পৌঁছে যায়। এমনকি সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণে এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সামাজিক মাধ্যমে জায়গা করে নেয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ আগস্ট সকালে। ভারতে অবস্থানকারী একটি বেনামি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্ফোরক দাবি করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) commander ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি বলেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও তা অর্জনের চেষ্টা থেকে পিছিয়ে আসবে না। পোস্টটিতে ওই জেনারেলের ছবির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি মাশরুম ক্লাউডের ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। বাস্তবে এই দাবির কোনো ভিত্তি বা প্রমাণ ছিল না এবং ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে এমন কোনো প্রমাণও মেলেনি।

ভিত্তিহীন এই দাবিটি দ্রুতই ইসরাইলি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেল এটিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে প্রচার করে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় জেরুজালেমের জাতীয় সমাধিক্ষেত্র মাউন্ট হার্জেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে এই দাবিটিকে ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।

ওয়াশিংটনেও এর হাওয়া লাগে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অনলাইনে এই পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, ইরান অবশেষে এমন কিছু স্বীকার করল যা বহু বছর ধরেই স্পষ্ট ছিল। ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কটও এটি পুনঃপ্রচার করেন এবং ফক্স নিউজ এই ভুয়া দাবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরবর্তীতে সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ওয়াল্টজ তাঁর পোস্টটি এক্স থেকে সরিয়ে নেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ভুয়া খবরের মূল উৎস ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার অনুসারী থাকা একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট। এর দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৮২ হাজার অনুসারী থাকা আরেকটি ভারতীয় অ্যাকাউন্ট এর হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করে। এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামের একটি ইসরাইলি অ্যাকাউন্ট (যার সঙ্গে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক যোগসূত্র নেই) পোস্টটি শেয়ার করে ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান আলোচনায় সময়ক্ষেপণ করছে। এর আধা ঘণ্টা পর ইসরাইলের চ্যানেল-১৪ ইংরেজিতে এটি প্রচার করে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ইয়াইর নেতানিয়াহু দ্রুতই পোস্টগুলো শেয়ার করেন এবং এর তিন ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে তা তাঁর বাবার ভাষণে যুক্ত হয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই ভাইরাল পোস্টটিকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজবের একটি বড় উদাহরণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি এই অপপ্রচারের পেছনে ইসরাইলকে দায়ী করেন। বাঘাইয়ের মতে, গত দুই দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রমাণে এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো মিথ্যা তথ্যও কত দ্রুত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২২আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০: ৩২

জনপ্রিয় সংবাদ

বাজারে কৃত্রিম সংকট ও পণ্য সিন্ডিকেটে কঠোর নিষেধ করেছে ইসলাম

ভারতীয় অ্যাকাউন্টের ভুয়া তথ্য যেভাবে ছড়াল নেতানিয়াহুর ভাষণে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩৭:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভুয়া তথ্য কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তার এক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ তৈরি হয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি বেনামি ভারতীয় এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো মনগড়া দাবি মুহূর্তের মধ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের কাছে পৌঁছে যায়। এমনকি সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণে এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সামাজিক মাধ্যমে জায়গা করে নেয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ আগস্ট সকালে। ভারতে অবস্থানকারী একটি বেনামি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্ফোরক দাবি করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) commander ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি বলেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও তা অর্জনের চেষ্টা থেকে পিছিয়ে আসবে না। পোস্টটিতে ওই জেনারেলের ছবির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি মাশরুম ক্লাউডের ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। বাস্তবে এই দাবির কোনো ভিত্তি বা প্রমাণ ছিল না এবং ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে এমন কোনো প্রমাণও মেলেনি।

ভিত্তিহীন এই দাবিটি দ্রুতই ইসরাইলি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেল এটিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে প্রচার করে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় জেরুজালেমের জাতীয় সমাধিক্ষেত্র মাউন্ট হার্জেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে এই দাবিটিকে ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।

ওয়াশিংটনেও এর হাওয়া লাগে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অনলাইনে এই পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, ইরান অবশেষে এমন কিছু স্বীকার করল যা বহু বছর ধরেই স্পষ্ট ছিল। ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কটও এটি পুনঃপ্রচার করেন এবং ফক্স নিউজ এই ভুয়া দাবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরবর্তীতে সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ওয়াল্টজ তাঁর পোস্টটি এক্স থেকে সরিয়ে নেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ভুয়া খবরের মূল উৎস ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার অনুসারী থাকা একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট। এর দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৮২ হাজার অনুসারী থাকা আরেকটি ভারতীয় অ্যাকাউন্ট এর হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করে। এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামের একটি ইসরাইলি অ্যাকাউন্ট (যার সঙ্গে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার কোনো আনুষ্ঠানিক যোগসূত্র নেই) পোস্টটি শেয়ার করে ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান আলোচনায় সময়ক্ষেপণ করছে। এর আধা ঘণ্টা পর ইসরাইলের চ্যানেল-১৪ ইংরেজিতে এটি প্রচার করে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ইয়াইর নেতানিয়াহু দ্রুতই পোস্টগুলো শেয়ার করেন এবং এর তিন ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে তা তাঁর বাবার ভাষণে যুক্ত হয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই ভাইরাল পোস্টটিকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজবের একটি বড় উদাহরণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি এই অপপ্রচারের পেছনে ইসরাইলকে দায়ী করেন। বাঘাইয়ের মতে, গত দুই দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রমাণে এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো মিথ্যা তথ্যও কত দ্রুত আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২২আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০: ৩২