লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক বছরেও কাটেনি ঢাবির আবাসন সংকট, নানা বিতর্কে ডাকসু নেতারা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ভোটের আগে প্রথম বর্ষ থেকেই হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ আসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের অমর একুশে হলের শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিমের ক্লাস শুরু হয়েছে গত এপ্রিলে। কিন্তু পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও তিনি হলের আসন পাননি। শাফিনূর জানান, হলের সিট না পেয়ে তাঁকে বাইরে ভাড়া থাকতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডাকসুর এই এক বছরে আবাসন সংকট, খাবারের মান ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিবিরের প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিযোগ, ডাকসুর নেতারা প্রতিশ্রুতি পূরণের চেয়ে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন বেশি। নির্বাচনের আগে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করলেও ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম নিজেই পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর লেজুড়বৃত্তি করেছেন এবং দলটির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। এমনকি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত তাঁকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা করেছে।

তবে বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ছাত্রলীগের দখলে থাকা ক্যাম্পাসের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অতীতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন, জোর করে মিছিলে নেওয়া ও হল থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন আর ঘটছে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার পর হলের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। বর্তমান ক্যাম্পাসে হল দখল বা মারামারির ঘটনা ঘটেনি এবং নির্বিঘ্নে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদলের ভূমিকাও ইতিবাচক ছিল, কারণ তারা আগের মতো হল দখলের চেষ্টা করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ভোটের রাজনীতির কারণে কিছু পরিবর্তন এসেছে তা সত্য, তবে এই পরিবর্তন কত দিন টেকসই হবে তা দেখার বিষয়।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়ী হয়েছিল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। সাদিক কায়েম ভিপি এবং এস এম ফরহাদ সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই শিবির-সমর্থিত প্যানেল জয়লাভ করেছিল। নিজেদের প্যানেল সাজানোর ক্ষেত্রে তারা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে বৈচিত্র্য দেখানোর কৌশল নিয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। ২০২৫ সালের আগস্টে ছাত্রদল হলে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয় এবং হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। অবশ্য ছাত্রদলের অভিযোগ ছিল, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে শিবিরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে এই আন্দোলন করিয়েছিল।

নির্বাচনী ইশতেহারে ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, তাঁরা সব কটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ভিপি সাদিক কায়েমের দাবি, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ বরাদ্দের বদলে কেবল কাজের অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তাও পাননি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন, ডাকসুর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়েও বেশি অর্থ তাদের দেওয়া হয়েছে।

ভিপি সাদিক কায়েমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে শিক্ষার্থীদের খাবারের মান তদারকিতে কমিটি গঠন, আবাসন সংকট নিরসনে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের উদ্বোধন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, অনলাইন পেমেন্টে ভর্তিপ্রক্রিয়া, কমনরুম সংস্কার, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন রিসোর্স যুক্ত করা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট সামিট এবং মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের মতো কাজগুলো করা হয়েছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, এই পরিবর্তনগুলো স্থায়ী বা টেকসই হয়নি। সম্প্রতি কয়েকটি হলের ক্যানটিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড ও তেলাপোকা পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসফিয়ান আহমেদ বলেন, দাবি জানানো বা বৈঠক করাকে নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করলেই প্রতিশ্রুতি পূরণ বলা যায় না, কারণ মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

একইভাবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং রুম, চাইল্ড কেয়ার কর্নার ও যাতায়াত সুবিধার কাজ করা হলেও অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশাধিকার বা সব কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগের মতো প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তী ও ইসরাত জাহান জানান, রাতে টিউশনি করে হলে ফেরার পথে ছাত্রীরা এখনো মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হন, যা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এর পাশাপাশি ডাকসুর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানো, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষককে হেনস্তা, কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, হিজড়াদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মাত্র তিনজনের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, নির্বাচনের আগে নিজেদের নির্দলীয় দেখানোর চেষ্টা করলেও জয়ের পরপরই ডাকসু নেতারা জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করেন। অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খানও মনে করেন, যে আধিপত্যবাদী ও ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা মব তৈরি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ও প্রতিপক্ষকে ট্যাগ দেওয়ার মাধ্যমে আবার ফিরে আসছে।

আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর নির্বাচন না হলে নিয়ম অনুযায়ী ডাকসুর মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়বে, অন্যথায় বর্তমান ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নতুন নির্বাচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ডাকসু নির্বাচন অবশ্যই হওয়া উচিত এবং তা হতেই হবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে অতীতে দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০১৯ সালে এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায়, নতুন নির্বাচন যথাসময়ে আয়োজন নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনে সংশয় রয়ে গেছে।

২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে, ২৯ বছর আগে।ডাকসুর মেয়াদ শেষ হবে ১৪ সেপ্টেম্বর।

জনপ্রিয় সংবাদ

৯% মুদ্রাস্ফীতিতে টিকে থাকার উপায়: হিসাবি হোন, সঞ্চয় করুন

এক বছরেও কাটেনি ঢাবির আবাসন সংকট, নানা বিতর্কে ডাকসু নেতারা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৩:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ভোটের আগে প্রথম বর্ষ থেকেই হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ আসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের অমর একুশে হলের শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিমের ক্লাস শুরু হয়েছে গত এপ্রিলে। কিন্তু পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও তিনি হলের আসন পাননি। শাফিনূর জানান, হলের সিট না পেয়ে তাঁকে বাইরে ভাড়া থাকতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডাকসুর এই এক বছরে আবাসন সংকট, খাবারের মান ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিবিরের প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিযোগ, ডাকসুর নেতারা প্রতিশ্রুতি পূরণের চেয়ে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন বেশি। নির্বাচনের আগে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করলেও ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম নিজেই পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর লেজুড়বৃত্তি করেছেন এবং দলটির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। এমনকি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত তাঁকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা করেছে।

তবে বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ছাত্রলীগের দখলে থাকা ক্যাম্পাসের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। অতীতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন, জোর করে মিছিলে নেওয়া ও হল থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন আর ঘটছে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার পর হলের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। বর্তমান ক্যাম্পাসে হল দখল বা মারামারির ঘটনা ঘটেনি এবং নির্বিঘ্নে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদলের ভূমিকাও ইতিবাচক ছিল, কারণ তারা আগের মতো হল দখলের চেষ্টা করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ভোটের রাজনীতির কারণে কিছু পরিবর্তন এসেছে তা সত্য, তবে এই পরিবর্তন কত দিন টেকসই হবে তা দেখার বিষয়।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়ী হয়েছিল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। সাদিক কায়েম ভিপি এবং এস এম ফরহাদ সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই শিবির-সমর্থিত প্যানেল জয়লাভ করেছিল। নিজেদের প্যানেল সাজানোর ক্ষেত্রে তারা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে বৈচিত্র্য দেখানোর কৌশল নিয়েছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পেলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। ২০২৫ সালের আগস্টে ছাত্রদল হলে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয় এবং হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। অবশ্য ছাত্রদলের অভিযোগ ছিল, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে শিবিরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে এই আন্দোলন করিয়েছিল।

নির্বাচনী ইশতেহারে ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, তাঁরা সব কটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ভিপি সাদিক কায়েমের দাবি, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ বরাদ্দের বদলে কেবল কাজের অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু তাও পাননি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন, ডাকসুর জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়েও বেশি অর্থ তাদের দেওয়া হয়েছে।

ভিপি সাদিক কায়েমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে শিক্ষার্থীদের খাবারের মান তদারকিতে কমিটি গঠন, আবাসন সংকট নিরসনে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের উদ্বোধন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, অনলাইন পেমেন্টে ভর্তিপ্রক্রিয়া, কমনরুম সংস্কার, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন রিসোর্স যুক্ত করা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট সামিট এবং মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের মতো কাজগুলো করা হয়েছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, এই পরিবর্তনগুলো স্থায়ী বা টেকসই হয়নি। সম্প্রতি কয়েকটি হলের ক্যানটিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড ও তেলাপোকা পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসফিয়ান আহমেদ বলেন, দাবি জানানো বা বৈঠক করাকে নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করলেই প্রতিশ্রুতি পূরণ বলা যায় না, কারণ মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

একইভাবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং রুম, চাইল্ড কেয়ার কর্নার ও যাতায়াত সুবিধার কাজ করা হলেও অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশাধিকার বা সব কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগের মতো প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তী ও ইসরাত জাহান জানান, রাতে টিউশনি করে হলে ফেরার পথে ছাত্রীরা এখনো মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হন, যা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এর পাশাপাশি ডাকসুর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানো, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষককে হেনস্তা, কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, হিজড়াদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মাত্র তিনজনের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, নির্বাচনের আগে নিজেদের নির্দলীয় দেখানোর চেষ্টা করলেও জয়ের পরপরই ডাকসু নেতারা জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করেন। অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খানও মনে করেন, যে আধিপত্যবাদী ও ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা মব তৈরি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ও প্রতিপক্ষকে ট্যাগ দেওয়ার মাধ্যমে আবার ফিরে আসছে।

আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর নির্বাচন না হলে নিয়ম অনুযায়ী ডাকসুর মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়বে, অন্যথায় বর্তমান ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নতুন নির্বাচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ডাকসু নির্বাচন অবশ্যই হওয়া উচিত এবং তা হতেই হবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে অতীতে দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০১৯ সালে এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায়, নতুন নির্বাচন যথাসময়ে আয়োজন নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনে সংশয় রয়ে গেছে।

২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে, ২৯ বছর আগে।ডাকসুর মেয়াদ শেষ হবে ১৪ সেপ্টেম্বর।