লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১,২৭৬ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প

দেশের ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার এবং সংস্কারের লক্ষ্যে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার।

দেশের ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার এবং সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে বড় ধরনের একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। 'ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২' (এফএসএসপি-২) নামের এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঢাকায় সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে। সভায় অনুমোদনের জন্য কার্যতালিকায় থাকা মোট ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। বাকি ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে।

প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কেনাকাটা কার্যক্রম আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা হবে। পাশাপাশি নীতিগত পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল প্রযুক্তির কারণে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সরকারি ও ইসলামি ব্যাংক ইতিমধ্যে তারল্য ও মূলধনসংকটে পড়েছে এবং কয়েকটির মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংক খাতের তদারকিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা সাইবার হামলা ও আন্তসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে জোর দেওয়া হবে আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের ওপর। শেষ ধাপে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া। এজন্য আমানত বিমা তহবিলের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক অবসায়ন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময় কমিয়ে আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত (পিবিসি) ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত ফলাফল অর্জনের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

এই প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশই রাখা হয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭১১ কোটি টাকা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শক সেবায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়িত ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রথম পর্যায়টি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। ওই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল ২৬২ মিলিয়ন ডলার। প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে মূলত আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হয়েছিল।

প্রকল্পটি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে শুধু প্রযুক্তি কেনাটাই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ তাগিদ দেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা দেবে সরকার: ড. তিতুমীর

ব্যাংক খাত সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১,২৭৬ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১০:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার এবং সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে বড় ধরনের একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। 'ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২' (এফএসএসপি-২) নামের এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঢাকায় সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে। সভায় অনুমোদনের জন্য কার্যতালিকায় থাকা মোট ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। বাকি ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে।

প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কেনাকাটা কার্যক্রম আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা হবে। পাশাপাশি নীতিগত পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল প্রযুক্তির কারণে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সরকারি ও ইসলামি ব্যাংক ইতিমধ্যে তারল্য ও মূলধনসংকটে পড়েছে এবং কয়েকটির মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাংক খাতের তদারকিতে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা সাইবার হামলা ও আন্তসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে আগের প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে জোর দেওয়া হবে আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের ওপর। শেষ ধাপে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া। এজন্য আমানত বিমা তহবিলের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক অবসায়ন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময় কমিয়ে আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নয়নে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত (পিবিসি) ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত ফলাফল অর্জনের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

এই প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশই রাখা হয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) সরঞ্জাম কেনার জন্য ৭১১ কোটি টাকা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শক সেবায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়িত ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রথম পর্যায়টি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। ওই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল ২৬২ মিলিয়ন ডলার। প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে মূলত আর্থিক খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হয়েছিল।

প্রকল্পটি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। তবে শুধু প্রযুক্তি কেনাটাই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ তাগিদ দেন।