লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রয়াণের ২৭ বছর: খলনায়ক থেকে যেভাবে জসীম হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক

ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক অনন্য নক্ষত্র, যিনি একই সঙ্গে খলনায়ক এবং নায়ক—দুই ভূমিকাতেই ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তিনি আর কেউ নন, ঢাকাই সিনেমার অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক চিত্রনায়ক জসীম। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। আজ তাঁর প্রয়াণের ২৭ বছর পূর্ণ হলো। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যতদিন থাকবে, এ দেশের মানুষ জসীমকে তত দিন গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।

১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর আসল নাম আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। শৈশব থেকেই অত্যন্ত দুঃসাহসী এই মানুষটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধফেরত এই তরুণই পরবর্তী সময়ে ঢালিউডে নিয়ে আসেন বীরত্ব ও লড়াইয়ের এক নতুন ধারা। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তবে ১৯৭৩ সালে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। এই ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলো পরিচালনা করেছিল তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’। এই গ্রুপের মাধ্যমেই মূলত ঢাকাই সিনেমায় ফাইটিং গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় এবং জসীম নির্মাতাদের নজরে আসেন।

খলনায়ক হিসেবে জসীমের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করে তোলে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিটি। এটি ছিল বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’র রিমেক, যেখানে তিনি গব্বর সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর সেই অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত ও ভয়ংকর ছিল যে মূল চরিত্রের ভারতীয় অভিনেতা আমজাদ খান পর্যন্ত জসীমের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এমনকি ‘আসামি হাজির’ ছবিতে নায়ক ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর লড়াই দেখতে সিনেমা হলের দরজা ভেঙে দর্শক ঢুকে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।

তবে জসীমের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ সিনেমার মাধ্যমে। এই ছবিতে প্রথমবার নায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির হন তিনি। ছবিটির অভূতপূর্ব সাফল্যের পর তিনি আর কখনো খল চরিত্রে ফিরে যাননি। পর্দায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক। আশির দশকে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাকশন হিরো। বিশেষ করে অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁরা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকা, আবার কখনো ভাই-বোনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের আবেগকে স্পর্শ করেছেন। ‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’, ‘বুকের ধন’ সিনেমাগুলোতে তিনি ছিলেন পারিবারিক নায়ক; অন্যদিকে ‘লালু মাস্তান’, ‘বারুদ’, ‘নবাবজাদা’ ছবিতে হাজির হয়েছেন অ্যাকশন হিরো হিসেবে। অভিনেত্রী রোজিনার সঙ্গেও তাঁর অনবদ্য জুটি আশির দশকে উপহার দিয়েছে একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা।

জসীমের অভিনীত প্রায় দুই শতাধিক ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’ ইত্যাদি। তাঁর সিনেমাগুলোতে প্রায়ই থাকত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি ভক্তি আর দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের গল্প, যা তাঁকে বাস্তব জীবনেরও এক প্রতীক করে তুলেছিল। শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শুটিংয়ের ফাঁকে প্রায়ই তরুণ সহকর্মীদের বলতেন, ‘দেশের জন্য গুলি খেয়েছি, এখন দর্শকের ভালোবাসার জন্য মার খাচ্ছি।’

ব্যক্তিগত জীবনে জসীমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে—এ কে রাহুল, এ কে সামী ও এ কে রাতুল। বাবার মতো তাঁরা অভিনয়ে না এলেও যুক্ত হয়েছেন সংগীতের ভুবনে। রাহুল গিটার বাজান ‘ট্রেনরেক’ ও ‘পরাহো’ ব্যান্ডে, আর সামী ও রাতুল যুক্ত ছিলেন ‘ওনড’ ব্যান্ডের সঙ্গে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ২০২৫ সালে ছোট ছেলে রাতুল মারা যান এবং বাবার কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়।

মৃত্যুর এত বছর পরও জসীম রয়ে গেছেন দর্শকের হৃদয়ে। বর্তমানে ইউটিউব বা ফেসবুক রিলসে তাঁর অভিনয়, নাচ ও অ্যাকশন দৃশ্যের ক্লিপগুলো এখনো তরুণদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে তৈরি হয় নানা মিম ও সংলাপের কার্ড, এমনকি বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় তাঁর সাদৃশ্য মডেল। জসীম প্রমাণ করে গেছেন, একজন খলনায়কও নিজের সাহস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী নায়ক হয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইস্তাম্বুল জাস্টিস সামিটে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগের আহ্বান আইনমন্ত্রীর

প্রয়াণের ২৭ বছর: খলনায়ক থেকে যেভাবে জসীম হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:০৩:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক অনন্য নক্ষত্র, যিনি একই সঙ্গে খলনায়ক এবং নায়ক—দুই ভূমিকাতেই ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তিনি আর কেউ নন, ঢাকাই সিনেমার অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক চিত্রনায়ক জসীম। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। আজ তাঁর প্রয়াণের ২৭ বছর পূর্ণ হলো। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যতদিন থাকবে, এ দেশের মানুষ জসীমকে তত দিন গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।

১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর আসল নাম আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। শৈশব থেকেই অত্যন্ত দুঃসাহসী এই মানুষটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধফেরত এই তরুণই পরবর্তী সময়ে ঢালিউডে নিয়ে আসেন বীরত্ব ও লড়াইয়ের এক নতুন ধারা। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তবে ১৯৭৩ সালে জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। এই ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলো পরিচালনা করেছিল তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’। এই গ্রুপের মাধ্যমেই মূলত ঢাকাই সিনেমায় ফাইটিং গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় এবং জসীম নির্মাতাদের নজরে আসেন।

খলনায়ক হিসেবে জসীমের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করে তোলে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিটি। এটি ছিল বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’র রিমেক, যেখানে তিনি গব্বর সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর সেই অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত ও ভয়ংকর ছিল যে মূল চরিত্রের ভারতীয় অভিনেতা আমজাদ খান পর্যন্ত জসীমের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এমনকি ‘আসামি হাজির’ ছবিতে নায়ক ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর লড়াই দেখতে সিনেমা হলের দরজা ভেঙে দর্শক ঢুকে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।

তবে জসীমের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ সিনেমার মাধ্যমে। এই ছবিতে প্রথমবার নায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির হন তিনি। ছবিটির অভূতপূর্ব সাফল্যের পর তিনি আর কখনো খল চরিত্রে ফিরে যাননি। পর্দায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক। আশির দশকে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাকশন হিরো। বিশেষ করে অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁরা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকা, আবার কখনো ভাই-বোনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের আবেগকে স্পর্শ করেছেন। ‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’, ‘বুকের ধন’ সিনেমাগুলোতে তিনি ছিলেন পারিবারিক নায়ক; অন্যদিকে ‘লালু মাস্তান’, ‘বারুদ’, ‘নবাবজাদা’ ছবিতে হাজির হয়েছেন অ্যাকশন হিরো হিসেবে। অভিনেত্রী রোজিনার সঙ্গেও তাঁর অনবদ্য জুটি আশির দশকে উপহার দিয়েছে একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা।

জসীমের অভিনীত প্রায় দুই শতাধিক ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’ ইত্যাদি। তাঁর সিনেমাগুলোতে প্রায়ই থাকত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি ভক্তি আর দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের গল্প, যা তাঁকে বাস্তব জীবনেরও এক প্রতীক করে তুলেছিল। শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শুটিংয়ের ফাঁকে প্রায়ই তরুণ সহকর্মীদের বলতেন, ‘দেশের জন্য গুলি খেয়েছি, এখন দর্শকের ভালোবাসার জন্য মার খাচ্ছি।’

ব্যক্তিগত জীবনে জসীমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে—এ কে রাহুল, এ কে সামী ও এ কে রাতুল। বাবার মতো তাঁরা অভিনয়ে না এলেও যুক্ত হয়েছেন সংগীতের ভুবনে। রাহুল গিটার বাজান ‘ট্রেনরেক’ ও ‘পরাহো’ ব্যান্ডে, আর সামী ও রাতুল যুক্ত ছিলেন ‘ওনড’ ব্যান্ডের সঙ্গে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, ২০২৫ সালে ছোট ছেলে রাতুল মারা যান এবং বাবার কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়।

মৃত্যুর এত বছর পরও জসীম রয়ে গেছেন দর্শকের হৃদয়ে। বর্তমানে ইউটিউব বা ফেসবুক রিলসে তাঁর অভিনয়, নাচ ও অ্যাকশন দৃশ্যের ক্লিপগুলো এখনো তরুণদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে তৈরি হয় নানা মিম ও সংলাপের কার্ড, এমনকি বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় তাঁর সাদৃশ্য মডেল। জসীম প্রমাণ করে গেছেন, একজন খলনায়কও নিজের সাহস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী নায়ক হয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।