লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনার আমতলী নদী ১ লাখ টাকায় ইজারা, বিপাকে ৫০ হাজার মানুষ

আষাঢ়ের বৃষ্টির পর খুলনার আকাশে তখন কড়া রোদ। বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের আমতলী নদীর পাড়ে বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন ৯০ বছর বয়সী কায়েম আলী বিশ্বাস। মোটা চশমার আড়াল থেকে নিবিষ্ট মনে বড়শির দিকে তাকিয়ে থাকা এই বৃদ্ধের থলেতে জমা হয়েছে মাত্র তিনটি ট্যাংরা মাছ। এত অল্প মাছেই তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর চলে যাবে জানিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করলেন। কায়েম আলী বললেন, নদীতে এখন মাছ ধরতে ভয় লাগে, কারণ শুনেছেন নদী নাকি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

বাস্তবে নদী বিক্রি না হলেও, ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন আমতলী নদীটিকে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়ে দেয়। এরপর থেকেই এই নদীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাছ ধরা ও পানির স্বাভাবিক ব্যবহার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অথচ দীর্ঘকাল ধরে এই নদীর মাছ ও পানির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীটির পানি দিয়ে প্রায় ২০ হাজার বিঘা কৃষিজমিতে চাষাবাদ করা হয় এবং উৎপাদিত ফসল পরিবহনের একমাত্র পথও এই নদী।

আমতলী নদীটি বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষি, পানিনিষ্কাশন ও মৎস্য সম্পদের অন্যতম প্রাণরেখা। খড়িয়া, বটবুনিয়া, বরাখালী, ছোটখড়িয়া, মরাখড়িয়া, গোন্ধামারী ও বটিয়াঘাটা খালের সঙ্গে সংযুক্ত এই নদীর মাধ্যমে উপজেলার অন্তত ৩৭টি গ্রামের প্রায় ৪৫ হাজার একর কৃষিজমির পানিনিষ্কাশন সম্পন্ন হয়। এই নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা আমন, আউশ ও বোরো ধানসহ তরমুজ, কুমড়া, তিল ও মুগ ডালের আবাদ করেন। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার বড় অবলম্বনও এই নদী। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম সেন জানান, এই নদীকে ঘিরেই তাঁদের অস্তিত্ব। ইজারা দেওয়ার পর থেকে নদীতে তাঁদের প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে ইজারাদারদের দেওয়া নেটপাটায় (মাছ চাষের বেড়া) পানি আটকে পুরো এলাকা প্লাবিত হলে স্থানীয় লোকজন একজোট হয়ে সেই নেটপাটা তুলে ফেলেন এবং পুনরায় মাছ ধরা শুরু করেন। আমতলা ব্রিজ থেকে নদী ঘেঁষে চলে যাওয়া ইটের সড়ক ধরে এগোলে এখনো নদীর বুকে কিছু দূর পরপর বাঁশের নেটপাটা এবং পাহারার জন্য তৈরি করা একটি ফাঁকা টিনের ঘর চোখে পড়ে। কলাতলা থেকে আমতলা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে ১৬টি গ্রাম।

নদীতে স্থানীয়দের অধিকার রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে বটিয়াঘাটা খাল-নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভাস মন্ডলকে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৩ সালে তিনবার জেল খাটতে হয়েছে। তিনি জানান, ইজারাদারেরা নদীতে আড়াআড়ি বাঁশ ও নেটপাটা দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেন। এর ফলে আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়, আবার বোরো মৌসুমে স্লুইসগেট দিয়ে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে পরিবেশ ও কৃষির মারাত্মক ক্ষতি সাধন করা হয়। মাত্র এক লাখ টাকার ইজারার জন্য হাজার হাজার মানুষের জীবনকে সংকটে ফেলা হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে এই নদীকে জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলে প্রথম সংকটের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে ২০০৬ সালে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী এবং ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসকের কাছে নদীটি উন্মুক্ত করার দাবি জানানো হয়। এরপর অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হলেও পুনরায় ইজারার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়রা আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০১০ সালে আদালতের আদেশে ইজারা কার্যক্রম স্থগিত হয়। দীর্ঘ ১২ বছর নদীটি উন্মুক্ত থাকার পর ২০২২ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এর পরের বছরই, অর্থাৎ ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন নদীটিকে ৬০ একর আয়তনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখিয়ে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বার্ষিক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যে ছয় বছরের জন্য ইজারা দেয়।

নথিপত্রে নদীটিকে ‘আমতলী নদী’ উল্লেখ করা হলেও বন্ধনীতে ‘বদ্ধ জলাশয়’ লিখে ইজারা দেওয়ার এই প্রশাসনিক কৌশলকে আইনবহির্ভূত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, সমষ্টির সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত নদী বা নৌপথ কোনো ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া যায় না। এছাড়া ২০১৯ সালে হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নদী-গবেষক তুহিন ওয়াদুদ জানান, নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ নষ্ট করার মাধ্যমে নদীকে জোরপূর্বক বদ্ধ জলাশয়ে রূপ দেওয়া হয়। যারা আইন লঙ্ঘন করে নদী ইজারা দিচ্ছেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ইজারার আনুষ্ঠানিক নাম সুধীর সরদার হলেও, এর নেপথ্যে ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হারুনুর রশিদ, যিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। গত ১৩ জুলাই খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত আমতলী নদী পরিদর্শনে যান এবং বিষয়টি তদন্ত করে ইজারা বাতিলের আশ্বাস দেন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি এবং পরবর্তীতে তাঁর কার্যালয়ে গেলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

মালয়েশিয়ার বিপক্ষে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের জয়

খুলনার আমতলী নদী ১ লাখ টাকায় ইজারা, বিপাকে ৫০ হাজার মানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:২২:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

আষাঢ়ের বৃষ্টির পর খুলনার আকাশে তখন কড়া রোদ। বটিয়াঘাটা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের আমতলী নদীর পাড়ে বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন ৯০ বছর বয়সী কায়েম আলী বিশ্বাস। মোটা চশমার আড়াল থেকে নিবিষ্ট মনে বড়শির দিকে তাকিয়ে থাকা এই বৃদ্ধের থলেতে জমা হয়েছে মাত্র তিনটি ট্যাংরা মাছ। এত অল্প মাছেই তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর চলে যাবে জানিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করলেন। কায়েম আলী বললেন, নদীতে এখন মাছ ধরতে ভয় লাগে, কারণ শুনেছেন নদী নাকি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

বাস্তবে নদী বিক্রি না হলেও, ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন আমতলী নদীটিকে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা দিয়ে দেয়। এরপর থেকেই এই নদীতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাছ ধরা ও পানির স্বাভাবিক ব্যবহার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অথচ দীর্ঘকাল ধরে এই নদীর মাছ ও পানির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীটির পানি দিয়ে প্রায় ২০ হাজার বিঘা কৃষিজমিতে চাষাবাদ করা হয় এবং উৎপাদিত ফসল পরিবহনের একমাত্র পথও এই নদী।

আমতলী নদীটি বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষি, পানিনিষ্কাশন ও মৎস্য সম্পদের অন্যতম প্রাণরেখা। খড়িয়া, বটবুনিয়া, বরাখালী, ছোটখড়িয়া, মরাখড়িয়া, গোন্ধামারী ও বটিয়াঘাটা খালের সঙ্গে সংযুক্ত এই নদীর মাধ্যমে উপজেলার অন্তত ৩৭টি গ্রামের প্রায় ৪৫ হাজার একর কৃষিজমির পানিনিষ্কাশন সম্পন্ন হয়। এই নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষকেরা আমন, আউশ ও বোরো ধানসহ তরমুজ, কুমড়া, তিল ও মুগ ডালের আবাদ করেন। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার বড় অবলম্বনও এই নদী। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম সেন জানান, এই নদীকে ঘিরেই তাঁদের অস্তিত্ব। ইজারা দেওয়ার পর থেকে নদীতে তাঁদের প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে ইজারাদারদের দেওয়া নেটপাটায় (মাছ চাষের বেড়া) পানি আটকে পুরো এলাকা প্লাবিত হলে স্থানীয় লোকজন একজোট হয়ে সেই নেটপাটা তুলে ফেলেন এবং পুনরায় মাছ ধরা শুরু করেন। আমতলা ব্রিজ থেকে নদী ঘেঁষে চলে যাওয়া ইটের সড়ক ধরে এগোলে এখনো নদীর বুকে কিছু দূর পরপর বাঁশের নেটপাটা এবং পাহারার জন্য তৈরি করা একটি ফাঁকা টিনের ঘর চোখে পড়ে। কলাতলা থেকে আমতলা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে ১৬টি গ্রাম।

নদীতে স্থানীয়দের অধিকার রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে বটিয়াঘাটা খাল-নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভাস মন্ডলকে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৩ সালে তিনবার জেল খাটতে হয়েছে। তিনি জানান, ইজারাদারেরা নদীতে আড়াআড়ি বাঁশ ও নেটপাটা দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেন। এর ফলে আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়, আবার বোরো মৌসুমে স্লুইসগেট দিয়ে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে পরিবেশ ও কৃষির মারাত্মক ক্ষতি সাধন করা হয়। মাত্র এক লাখ টাকার ইজারার জন্য হাজার হাজার মানুষের জীবনকে সংকটে ফেলা হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে এই নদীকে জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া শুরু হলে প্রথম সংকটের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে ২০০৬ সালে তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী এবং ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসকের কাছে নদীটি উন্মুক্ত করার দাবি জানানো হয়। এরপর অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হলেও পুনরায় ইজারার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়রা আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০১০ সালে আদালতের আদেশে ইজারা কার্যক্রম স্থগিত হয়। দীর্ঘ ১২ বছর নদীটি উন্মুক্ত থাকার পর ২০২২ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এর পরের বছরই, অর্থাৎ ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন নদীটিকে ৬০ একর আয়তনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখিয়ে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বার্ষিক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যে ছয় বছরের জন্য ইজারা দেয়।

নথিপত্রে নদীটিকে ‘আমতলী নদী’ উল্লেখ করা হলেও বন্ধনীতে ‘বদ্ধ জলাশয়’ লিখে ইজারা দেওয়ার এই প্রশাসনিক কৌশলকে আইনবহির্ভূত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী, সমষ্টির সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত নদী বা নৌপথ কোনো ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া যায় না। এছাড়া ২০১৯ সালে হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নদী-গবেষক তুহিন ওয়াদুদ জানান, নদীতে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ নষ্ট করার মাধ্যমে নদীকে জোরপূর্বক বদ্ধ জলাশয়ে রূপ দেওয়া হয়। যারা আইন লঙ্ঘন করে নদী ইজারা দিচ্ছেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ইজারার আনুষ্ঠানিক নাম সুধীর সরদার হলেও, এর নেপথ্যে ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হারুনুর রশিদ, যিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। গত ১৩ জুলাই খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত আমতলী নদী পরিদর্শনে যান এবং বিষয়টি তদন্ত করে ইজারা বাতিলের আশ্বাস দেন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি এবং পরবর্তীতে তাঁর কার্যালয়ে গেলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।