লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানীর ফুটপাতে বিদ্যুৎ চুরির বিশাল সিন্ডিকেট, বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে হাজার হাজার উচ্চ ক্ষমতার এলইডি বাতি, টিউবলাইট ও ফ্যান। তবে এই কৃত্রিম আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে রয়েছে সরকারি সম্পদ চুরির এক বিস্তৃত ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। বৈধ কোনো মিটার বা সংযোগ ছাড়াই পুরো ঢাকা শহরের ফুটপাতে প্রতি সন্ধ্যায় কয়েক লাখ অবৈধ বাতি জ্বলছে সম্পূর্ণ চোরাই সংযোগে। সাধারণ নাগরিক যখন বিদ্যুৎ বিলের চাপে দিশেহারা, তখন ফুটপাতের এই চোরাই লাইন থেকে অর্জিত কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী চক্রের পকেটে।

ডিপিডিসি ও ডেসকোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং টহল পুলিশের একটি অংশের ছায়াতলে চলছে এই হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, গুলিস্তান, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১০ এবং নিউ মার্কেট এলাকায় বিকেলের আলো কমতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চিহ্নিত ক্যাডার ও লাইনম্যানরা। তারা সরকারি বিদ্যুতের খুঁটি, ফিডার বক্স, ট্রান্সফরমার এবং রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে সরাসরি হুকিং করে মাকড়সার জালের মতো বিপজ্জনক সংযোগ তৈরি করে।

এই সিন্ডিকেট প্রতিটি ফুটপাতে দোকানপ্রতি দৈনিক ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ আদায় করে। শুধু গুলিস্তান ও পল্টন এলাকাতেই অন্তত আট হাজার অবৈধ দোকান থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বছরে শুধু এই একটি এলাকা থেকেই আদায় হচ্ছে ৩৬ কোটি টাকা। এই পুরো টাকা চলে যায় লাইনম্যান, ডিপিডিসির দুর্নীতিবাজ পরিদর্শন কর্মী এবং স্থানীয় অসাধু পুলিশ সদস্যদের পকেটে। সরকার বা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এখান থেকে এক টাকাও রাজস্ব পায় না, বরং সিস্টেম লসের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ বৈধ গ্রাহকদের ওপর।

অনুসন্ধানে সিন্ডিকেট পরিচালনাকারীদের নাম উঠে এসেছে। গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট এলাকায় কালাম ওরফে কারেন্ট কালাম এবং ইসমাইল প্রায় দুই হাজার বাতির সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে রানা কসাই ও বিল্লাল, নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায় ফেনী সাইদুল ও রফিক, মিরপুর-১০ এলাকায় আবুল কালাম ওরফে মিরপুর কালাম এবং কারওয়ান বাজারে জসিম উদ্দিন ওরফে জসিম লাইনম্যান সক্রিয় রয়েছেন। গুলিস্তানের পোশাক বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কালামের লোক এসে বাতিপ্রতি ১০০ টাকা নিয়ে যায়, টাকা না দিলে বাতি খুলে নেওয়া হয়। ফার্মগেটের ফল বিক্রেতা আবদুল মালেক ও নিউ মার্কেটের জুতার হকার শাহজাহান মিয়াও একই ধরনের চাঁদাবাজির কথা জানিয়েছেন।

ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, তারা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও অসাধু চক্র দ্রুতই নতুন করে সংযোগ দিয়ে দেয়। তিনি বলেন, রাতে ফুটপাতে অভিযান চালাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিপিডিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, নিচের তলার কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া এই নেটওয়ার্ক চলা অসম্ভব। পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানান, তারা সমন্বয় সভায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) জানিয়েছেন, পুলিশ বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে এবং অসাধু সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, এই অপরিকল্পিত হুকিং রাজধানীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করছে, পাওয়ার ফ্যাক্টর নষ্ট করছে এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের শর্ট সার্কিট বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারীতে এমপির সামনেই সাঁকো ভেঙে নদীতে পড়লেন নেতাকর্মীরা

রাজধানীর ফুটপাতে বিদ্যুৎ চুরির বিশাল সিন্ডিকেট, বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:২৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাতগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে হাজার হাজার উচ্চ ক্ষমতার এলইডি বাতি, টিউবলাইট ও ফ্যান। তবে এই কৃত্রিম আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে রয়েছে সরকারি সম্পদ চুরির এক বিস্তৃত ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। বৈধ কোনো মিটার বা সংযোগ ছাড়াই পুরো ঢাকা শহরের ফুটপাতে প্রতি সন্ধ্যায় কয়েক লাখ অবৈধ বাতি জ্বলছে সম্পূর্ণ চোরাই সংযোগে। সাধারণ নাগরিক যখন বিদ্যুৎ বিলের চাপে দিশেহারা, তখন ফুটপাতের এই চোরাই লাইন থেকে অর্জিত কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী চক্রের পকেটে।

ডিপিডিসি ও ডেসকোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এবং টহল পুলিশের একটি অংশের ছায়াতলে চলছে এই হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, গুলিস্তান, ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন, কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১০ এবং নিউ মার্কেট এলাকায় বিকেলের আলো কমতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চিহ্নিত ক্যাডার ও লাইনম্যানরা। তারা সরকারি বিদ্যুতের খুঁটি, ফিডার বক্স, ট্রান্সফরমার এবং রাস্তার লাইটপোস্ট থেকে সরাসরি হুকিং করে মাকড়সার জালের মতো বিপজ্জনক সংযোগ তৈরি করে।

এই সিন্ডিকেট প্রতিটি ফুটপাতে দোকানপ্রতি দৈনিক ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ আদায় করে। শুধু গুলিস্তান ও পল্টন এলাকাতেই অন্তত আট হাজার অবৈধ দোকান থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বছরে শুধু এই একটি এলাকা থেকেই আদায় হচ্ছে ৩৬ কোটি টাকা। এই পুরো টাকা চলে যায় লাইনম্যান, ডিপিডিসির দুর্নীতিবাজ পরিদর্শন কর্মী এবং স্থানীয় অসাধু পুলিশ সদস্যদের পকেটে। সরকার বা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এখান থেকে এক টাকাও রাজস্ব পায় না, বরং সিস্টেম লসের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ বৈধ গ্রাহকদের ওপর।

অনুসন্ধানে সিন্ডিকেট পরিচালনাকারীদের নাম উঠে এসেছে। গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট এলাকায় কালাম ওরফে কারেন্ট কালাম এবং ইসমাইল প্রায় দুই হাজার বাতির সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে রানা কসাই ও বিল্লাল, নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায় ফেনী সাইদুল ও রফিক, মিরপুর-১০ এলাকায় আবুল কালাম ওরফে মিরপুর কালাম এবং কারওয়ান বাজারে জসিম উদ্দিন ওরফে জসিম লাইনম্যান সক্রিয় রয়েছেন। গুলিস্তানের পোশাক বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কালামের লোক এসে বাতিপ্রতি ১০০ টাকা নিয়ে যায়, টাকা না দিলে বাতি খুলে নেওয়া হয়। ফার্মগেটের ফল বিক্রেতা আবদুল মালেক ও নিউ মার্কেটের জুতার হকার শাহজাহান মিয়াও একই ধরনের চাঁদাবাজির কথা জানিয়েছেন।

ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, তারা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও অসাধু চক্র দ্রুতই নতুন করে সংযোগ দিয়ে দেয়। তিনি বলেন, রাতে ফুটপাতে অভিযান চালাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিপিডিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, নিচের তলার কর্মচারীদের যোগসাজশ ছাড়া এই নেটওয়ার্ক চলা অসম্ভব। পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানান, তারা সমন্বয় সভায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) জানিয়েছেন, পুলিশ বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে এবং অসাধু সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান একে সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, এই অপরিকল্পিত হুকিং রাজধানীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করছে, পাওয়ার ফ্যাক্টর নষ্ট করছে এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের শর্ট সার্কিট বা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।