লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান: সিন্ডিকেট ভাঙবে কে?

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন সোনা চোরাচালানের একটি নিরাপদ করিডরে পরিণত হয়েছে। একের পর এক অভিযান চালানো হলেও থামছে না চোরাচালান। ফলের ক্যারেট, বিমানের টয়লেট কিংবা যাত্রীর শরীর—কোথাও বাদ যাচ্ছে না পাচারের কৌশল। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে চোরাকারবারিরা। অতীতে দু-এক কেজির চালান ধরা পড়লেও এখন একেকটি চালানে মিলছে ১৫ থেকে ২০ কেজি সোনা। গত পাঁচ বছরে এই বিমানবন্দর থেকে প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানবন্দরের ভেতরের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় চালান বারবার আসা অসম্ভব।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো না কোনো পর্যায়ে সংঘবদ্ধ সহযোগিতা রয়েছে। শুধু বাহককে আটক করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত রোটেশন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ দাবি করেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারি মুক্ত রাখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং নজরদারির কারণেই চালানগুলো ধরা পড়ছে।

বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৬ সাল) সোনা চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি ও ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে। ঢাকা কাস্টমসের তথ্যমতে, এই সময়ে শতাধিক অভিযানে জব্দ করা প্রায় ২ হাজার কেজি সোনার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭০ কেজির কিছু বেশি সোনা জব্দ হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারে অন্তত অর্ধশতাধিক কৌশল ব্যবহার করা হয়। অতীতে কেবিন ক্রু, পাইলট, প্রকৌশলী, ট্রলিম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও এসেছে। সম্প্রতি দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ফ্লাইটকে নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে আকাশপথেই যাত্রী অদলবদলের মাধ্যমে সোনা হস্তান্তর করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক এই চক্রে অন্তত অর্ধশত মাফিয়া এবং দুই শতাধিক মাঝারি চোরাকারবারি রয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার, মুন্সীগঞ্জের জুমন এবং দুবাইয়ে থাকা শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় রয়েছে।

চলতি বছরেই শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনার তিনটি বড় চালান জব্দ হয়েছে। ২৮ মার্চ বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম, ২ জুলাই ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম এবং ১৯ জুলাই ফলের ক্যারেটের ভেতর থেকে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম জানান, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না এবং তদন্তে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং খুব শিগগিরই পুরো চক্রের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সুপ্রিম কোর্টে নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রতিবাদে আইনজীবীদের বিক্ষোভ

শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান: সিন্ডিকেট ভাঙবে কে?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৪৩:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন সোনা চোরাচালানের একটি নিরাপদ করিডরে পরিণত হয়েছে। একের পর এক অভিযান চালানো হলেও থামছে না চোরাচালান। ফলের ক্যারেট, বিমানের টয়লেট কিংবা যাত্রীর শরীর—কোথাও বাদ যাচ্ছে না পাচারের কৌশল। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে চোরাকারবারিরা। অতীতে দু-এক কেজির চালান ধরা পড়লেও এখন একেকটি চালানে মিলছে ১৫ থেকে ২০ কেজি সোনা। গত পাঁচ বছরে এই বিমানবন্দর থেকে প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমানবন্দরের ভেতরের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় চালান বারবার আসা অসম্ভব।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো না কোনো পর্যায়ে সংঘবদ্ধ সহযোগিতা রয়েছে। শুধু বাহককে আটক করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত রোটেশন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ দাবি করেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারি মুক্ত রাখতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং নজরদারির কারণেই চালানগুলো ধরা পড়ছে।

বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৬ সাল) সোনা চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি ও ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে। ঢাকা কাস্টমসের তথ্যমতে, এই সময়ে শতাধিক অভিযানে জব্দ করা প্রায় ২ হাজার কেজি সোনার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭০ কেজির কিছু বেশি সোনা জব্দ হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারে অন্তত অর্ধশতাধিক কৌশল ব্যবহার করা হয়। অতীতে কেবিন ক্রু, পাইলট, প্রকৌশলী, ট্রলিম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও এসেছে। সম্প্রতি দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ফ্লাইটকে নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে আকাশপথেই যাত্রী অদলবদলের মাধ্যমে সোনা হস্তান্তর করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক এই চক্রে অন্তত অর্ধশত মাফিয়া এবং দুই শতাধিক মাঝারি চোরাকারবারি রয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার, মুন্সীগঞ্জের জুমন এবং দুবাইয়ে থাকা শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় রয়েছে।

চলতি বছরেই শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনার তিনটি বড় চালান জব্দ হয়েছে। ২৮ মার্চ বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম, ২ জুলাই ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম এবং ১৯ জুলাই ফলের ক্যারেটের ভেতর থেকে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম জানান, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না এবং তদন্তে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং খুব শিগগিরই পুরো চক্রের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে।