লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড, চুক্তি আজ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর ডিপি ওয়ার্ল্ড এই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করবে। বিনিময়ে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থ এবং কনটেইনারপ্রতি নির্দিষ্ট মাশুল দেবে। তবে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।

এই চুক্তি সম্পন্ন হলে এনসিটি হবে বিদেশি অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময়ে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালটি সুইজারল্যান্ডের মেডলগের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। বর্তমানে বিদেশি অপারেটরদের বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি টার্মিনাল রয়েছে, যা দেশীয় অপারেটররাই পরিচালনা করছে।

২০০৭ সালে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নিউমুরিং টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। চালুর পর থেকে এটি দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল। মূলত এই টার্মিনালে জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং আমদানি কনটেইনার নামানোর কাজ করা হয়। ২০০৮ সালে প্রথম এই টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও-সহ (যা পরে ডিপি ওয়ার্ল্ড কিনে নেয়) চারটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নতুন করে ইজারা প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে দুবাই সরকার ও বাংলাদেশের পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এনসিটি ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলে। তবে বন্দর শ্রমিকদের আন্দোলন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য বাড়তি সময় চাওয়ার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে চুক্তিটি সই হতে পারেনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত হওয়া প্রক্রিয়াটি পুনরায় সচল হয়। গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভার পর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন প্রস্তাব পেশ করে। সেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত করা হয়। অবশেষে গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়।

এদিকে এই ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর এলাকায় নতুন করে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলন হয়েছিল, যেখানে নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। এখন নির্বাচিত সরকারের আমলেও 'বন্দর রক্ষা আন্দোলন'-এর ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা সক্রিয় রয়েছেন। গত সোমবার এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার বন্দর এলাকায় মশাল মিছিলও করেছেন আন্দোলনকারীরা।

উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে নিউমুরিং টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ডিপি ওয়ার্ল্ডের দায়িত্ব নেওয়ার সুফল পেতে হলে তাদের অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ করতে হবে বলে মনে করেন বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম। তিনি জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড অনেক আগেই অবকাঠামো খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন এনসিটির পূর্ণ সুফল পেতে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আনতে ধীরাশ্রম অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও তার সঙ্গে রেল যোগাযোগে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যা ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনদক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভিনিসিয়ুসের বাজারমূল্যে বড় ধস, তিন বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে তারকা

১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড, চুক্তি আজ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৪৭:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর ডিপি ওয়ার্ল্ড এই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করবে। বিনিময়ে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থ এবং কনটেইনারপ্রতি নির্দিষ্ট মাশুল দেবে। তবে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।

এই চুক্তি সম্পন্ন হলে এনসিটি হবে বিদেশি অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সময়ে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালটি সুইজারল্যান্ডের মেডলগের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। বর্তমানে বিদেশি অপারেটরদের বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি টার্মিনাল রয়েছে, যা দেশীয় অপারেটররাই পরিচালনা করছে।

২০০৭ সালে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নিউমুরিং টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। চালুর পর থেকে এটি দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল। মূলত এই টার্মিনালে জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং আমদানি কনটেইনার নামানোর কাজ করা হয়। ২০০৮ সালে প্রথম এই টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও-সহ (যা পরে ডিপি ওয়ার্ল্ড কিনে নেয়) চারটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তীতে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নতুন করে ইজারা প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে দুবাই সরকার ও বাংলাদেশের পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এনসিটি ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলে। তবে বন্দর শ্রমিকদের আন্দোলন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য বাড়তি সময় চাওয়ার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে চুক্তিটি সই হতে পারেনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত হওয়া প্রক্রিয়াটি পুনরায় সচল হয়। গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভার পর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন প্রস্তাব পেশ করে। সেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত করা হয়। অবশেষে গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়।

এদিকে এই ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর এলাকায় নতুন করে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলন হয়েছিল, যেখানে নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। এখন নির্বাচিত সরকারের আমলেও 'বন্দর রক্ষা আন্দোলন'-এর ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা সক্রিয় রয়েছেন। গত সোমবার এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার বন্দর এলাকায় মশাল মিছিলও করেছেন আন্দোলনকারীরা।

উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে নিউমুরিং টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ডিপি ওয়ার্ল্ডের দায়িত্ব নেওয়ার সুফল পেতে হলে তাদের অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ করতে হবে বলে মনে করেন বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম। তিনি জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড অনেক আগেই অবকাঠামো খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। এখন এনসিটির পূর্ণ সুফল পেতে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আনতে ধীরাশ্রম অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও তার সঙ্গে রেল যোগাযোগে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যা ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনদক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।