লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও সংবিধান অনুযায়ী তার স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত। বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বাড়ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ আলোচিত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরে কমিশনগুলোর প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ, যেখানে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সম্পর্কিত।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্যকর ভারসাম্যের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি। ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও ক্ষমতায়ন। গণতন্ত্র সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও পরিপূরক করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়।

এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো, কিছু নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তির দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী থাকার সুযোগ বন্ধ এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় কিছু পরিবর্তন আসে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়—জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের প্রধান ও সদস্য, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন থাকবেন। এসব ক্ষেত্রে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির আপত্তি আছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা কাজ শুরু করেছে। তবে বিরোধী দল কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়েছে, তবে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। দলটি উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির কথাও বলেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও জুলাই সনদে প্রস্তাব আছে। এখন ভোট হয় প্রকাশ্যে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। জুলাই সনদে সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব আছে। সেখানে বলা হয়েছে, অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। তবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে—তারা বলেছে, অর্থ বিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

গতকাল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকেও আমরা এগোতে পারতাম; কিন্তু সেটা হচ্ছে না।’ একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়ে যাবে, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে।’

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও সংবিধান অনুযায়ী তার স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত। বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বাড়ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ আলোচিত হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরে কমিশনগুলোর প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ, যেখানে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সম্পর্কিত।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্যকর ভারসাম্যের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি। ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও ক্ষমতায়ন। গণতন্ত্র সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও পরিপূরক করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়।

এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো, কিছু নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তির দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী থাকার সুযোগ বন্ধ এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় কিছু পরিবর্তন আসে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয়—জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, তথ্য কমিশনের প্রধান ও সদস্য, প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীন থাকবেন। এসব ক্ষেত্রে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির আপত্তি আছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা কাজ শুরু করেছে। তবে বিরোধী দল কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়েছে, তবে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। দলটি উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির কথাও বলেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও জুলাই সনদে প্রস্তাব আছে। এখন ভোট হয় প্রকাশ্যে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। জুলাই সনদে সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব আছে। সেখানে বলা হয়েছে, অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। তবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে—তারা বলেছে, অর্থ বিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

গতকাল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকেও আমরা এগোতে পারতাম; কিন্তু সেটা হচ্ছে না।’ একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়ে যাবে, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে।’