লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বদলে যাচ্ছে সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি, বাড়তে পারে জনভোগান্তি

স্থাবর সম্পত্তির বিদ্যমান বাজারমূল্যের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। ০২ নভেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নতুন মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ করতে ‘স্থাবর সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা-২০১০’ সংশোধন করে খসড়া চূড়ান্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত খসড়াটি ইতোমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শামীমা আফরোজার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই দ্রুত এ সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালা জারি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ২০১০ সালের বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আগের বিধিমালার ৪(১) বিধি অনুযায়ী জেলা রেজিস্ট্রারের সভাপতিত্বে গঠিত দুই বছরের জন্য বাজারমূল্য নির্ধারণকারী কমিটির কার্যকারিতা আর থাকছে না। নতুন বিধিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা—এই তিন স্তরে বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে বিভাগীয় কমিটিতে ৮ জন, জেলা কমিটিতে ১১ জন এবং উপজেলা কমিটিতে ৯ জন সদস্য থাকবেন। সাবরেজিস্ট্রারদের স্থানীয় অধিক্ষেত্রের জমি মূল্যায়নের জন্য এসব কমিটি কাজ করবে।

বিধিমালার সংশোধনীতে যে বছরে বাজারমূল্যের মেয়াদ শেষ হবে, সেই বছরের ১ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এলাকার প্রতিটি মৌজার শ্রেণিভিত্তিক বাজারমূল্য তালিকার খসড়া প্রস্তুতের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তুতকৃত তালিকা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠাতে হবে। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি, ব্যবহার, অবস্থান, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও সরকারি মালিকানাধীন সম্পত্তি এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাজারমূল্য বিবেচনা করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

সংশোধিত বিধিমালার কিছু নির্দিষ্ট ধারায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিধি ১-এর উপবিধি (১)-এ থাকা ‘সম্পত্তির’ শব্দটির পর থেকে ‘সর্বনিম্ন’ শব্দটি বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিধি ২(গ)-এর জায়গায় ‘বাজারমূল্য’ বলতে সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্যকে বোঝানো হবে। এছাড়া ৫(৩) উপবিধি সংশোধন করে বলা হয়েছে, সরকার চাইলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও বাজারমূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে গঠিত কমিটি যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে নতুন তালিকা পাঠালে নিবন্ধন অধিদপ্তর তা কার্যকর করবে।

বিধি (৭)-এর গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনে বলা হয়েছে, আদালত কর্তৃক চুক্তি প্রবলের মামলায় সম্পাদিত দলিলের মূল্য প্রদর্শিত দরেই রেজিস্ট্রি করতে হবে। অন্যদিকে বায়না দলিলের ক্ষেত্রে, সেখানে দেখানো মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে কম হলে রেজিস্ট্রি বিদ্যমান বাজারমূল্য অনুযায়ী হবে। তবে বায়না দলিলে প্রদর্শিত মূল্য যদি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তবে বায়না দলিলের দামেই বিক্রি দলিল রেজিস্ট্রি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে প্রস্তাবিত এসব বিধিমালা নিয়ে সাবরেজিস্ট্রারদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার জানান, বিধিমালার ৫(ঙ) উপবিধিতে গণশুনানি, স্থানীয় অনুসন্ধান এবং বাজারমূল্যের তারতম্য ঘটলে একাধিক ‘ক্লাস্টার’ করার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও পদে পদে ঘুসের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে। ক্লাস্টার তৈরির ঝামেলায় তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে, যার ফলে সাধারণ মানুষ নির্ধারিত সময়ে সম্পত্তি কেনাবেচা করতে সমস্যায় পড়বেন।

সাবরেজিস্ট্রাররা আরও অভিযোগ করেন, গঠিত তিনস্তরের কমিটিতে এমন সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে যাদের কাজের সঙ্গে জমি বা সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই। এর চেয়ে এনবিআর বা রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। তাদের মতে, সুযোগসন্ধানীরা এই বিধির সুযোগ নিয়ে সরকার কোনো জমি অধিগ্রহণ করার আগেই সেই মৌজার জমির দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সরকারকে বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে এবং শত শত রিট মামলা ফেস করতে হতে পারে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, উলটো তা কমে যেতে পারে।

এসি ল্যান্ড অফিসগুলোর নামজারি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে সাবরেজিস্ট্রাররা বলেন, নানামুখী সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দলিল নিবন্ধনে তারা মাত্র ১ মিনিট সময় নেন এবং রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৮৯ ধারা মেনে নিয়মিত এলটি নোটিশ পাঠান। কিন্তু পরিপত্র ও ১৯৫০ সালের আইনের ১৪৩ সি (২) ও (৩) ধারার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসিল্যান্ড অফিসে নামজারি করতে সেবাপ্রার্থীদের ২৮ দিন থেকে শুরু করে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ আইন না জানার সুযোগে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

বদলে যাচ্ছে সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি, বাড়তে পারে জনভোগান্তি

বদলে যাচ্ছে সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি, বাড়তে পারে জনভোগান্তি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৪০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

স্থাবর সম্পত্তির বিদ্যমান বাজারমূল্যের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। ০২ নভেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নতুন মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া শেষ করতে ‘স্থাবর সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা-২০১০’ সংশোধন করে খসড়া চূড়ান্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত খসড়াটি ইতোমধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শামীমা আফরোজার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই দ্রুত এ সংক্রান্ত সংশোধিত বিধিমালা জারি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ২০১০ সালের বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আগের বিধিমালার ৪(১) বিধি অনুযায়ী জেলা রেজিস্ট্রারের সভাপতিত্বে গঠিত দুই বছরের জন্য বাজারমূল্য নির্ধারণকারী কমিটির কার্যকারিতা আর থাকছে না। নতুন বিধিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা—এই তিন স্তরে বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে বিভাগীয় কমিটিতে ৮ জন, জেলা কমিটিতে ১১ জন এবং উপজেলা কমিটিতে ৯ জন সদস্য থাকবেন। সাবরেজিস্ট্রারদের স্থানীয় অধিক্ষেত্রের জমি মূল্যায়নের জন্য এসব কমিটি কাজ করবে।

বিধিমালার সংশোধনীতে যে বছরে বাজারমূল্যের মেয়াদ শেষ হবে, সেই বছরের ১ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এলাকার প্রতিটি মৌজার শ্রেণিভিত্তিক বাজারমূল্য তালিকার খসড়া প্রস্তুতের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তুতকৃত তালিকা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠাতে হবে। মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি, ব্যবহার, অবস্থান, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও সরকারি মালিকানাধীন সম্পত্তি এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাজারমূল্য বিবেচনা করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

সংশোধিত বিধিমালার কিছু নির্দিষ্ট ধারায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিধি ১-এর উপবিধি (১)-এ থাকা ‘সম্পত্তির’ শব্দটির পর থেকে ‘সর্বনিম্ন’ শব্দটি বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিধি ২(গ)-এর জায়গায় ‘বাজারমূল্য’ বলতে সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্যকে বোঝানো হবে। এছাড়া ৫(৩) উপবিধি সংশোধন করে বলা হয়েছে, সরকার চাইলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও বাজারমূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে গঠিত কমিটি যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে নতুন তালিকা পাঠালে নিবন্ধন অধিদপ্তর তা কার্যকর করবে।

বিধি (৭)-এর গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনে বলা হয়েছে, আদালত কর্তৃক চুক্তি প্রবলের মামলায় সম্পাদিত দলিলের মূল্য প্রদর্শিত দরেই রেজিস্ট্রি করতে হবে। অন্যদিকে বায়না দলিলের ক্ষেত্রে, সেখানে দেখানো মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে কম হলে রেজিস্ট্রি বিদ্যমান বাজারমূল্য অনুযায়ী হবে। তবে বায়না দলিলে প্রদর্শিত মূল্য যদি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তবে বায়না দলিলের দামেই বিক্রি দলিল রেজিস্ট্রি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে প্রস্তাবিত এসব বিধিমালা নিয়ে সাবরেজিস্ট্রারদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার জানান, বিধিমালার ৫(ঙ) উপবিধিতে গণশুনানি, স্থানীয় অনুসন্ধান এবং বাজারমূল্যের তারতম্য ঘটলে একাধিক ‘ক্লাস্টার’ করার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও পদে পদে ঘুসের সুযোগ বাড়িয়ে দেবে। ক্লাস্টার তৈরির ঝামেলায় তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে, যার ফলে সাধারণ মানুষ নির্ধারিত সময়ে সম্পত্তি কেনাবেচা করতে সমস্যায় পড়বেন।

সাবরেজিস্ট্রাররা আরও অভিযোগ করেন, গঠিত তিনস্তরের কমিটিতে এমন সব দপ্তরের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে যাদের কাজের সঙ্গে জমি বা সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই। এর চেয়ে এনবিআর বা রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। তাদের মতে, সুযোগসন্ধানীরা এই বিধির সুযোগ নিয়ে সরকার কোনো জমি অধিগ্রহণ করার আগেই সেই মৌজার জমির দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সরকারকে বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে এবং শত শত রিট মামলা ফেস করতে হতে পারে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, উলটো তা কমে যেতে পারে।

এসি ল্যান্ড অফিসগুলোর নামজারি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে সাবরেজিস্ট্রাররা বলেন, নানামুখী সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দলিল নিবন্ধনে তারা মাত্র ১ মিনিট সময় নেন এবং রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৮৯ ধারা মেনে নিয়মিত এলটি নোটিশ পাঠান। কিন্তু পরিপত্র ও ১৯৫০ সালের আইনের ১৪৩ সি (২) ও (৩) ধারার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসিল্যান্ড অফিসে নামজারি করতে সেবাপ্রার্থীদের ২৮ দিন থেকে শুরু করে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ আইন না জানার সুযোগে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।