লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন মাসের কমিটি পার করল ৮ বছর, রাজশাহী জেলা বিএনপিতে ক্ষোভ

তিন মাসের জন্য গঠিত রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে পূর্ণাঙ্গ বা নতুন কোনো আহ্বায়ক কমিটি গঠন না হওয়ায় থমকে গেছে দলীয় কার্যক্রম। নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এই দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক স্থবিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে।

২০১৯ সালের ৬ জুলাই কেন্দ্র থেকে রাজশাহী জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যের এই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সময় কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও দীর্ঘ প্রায় আট বছরেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এই কমিটিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সাঈদ চাঁদকে আহ্বায়ক এবং বিশ্বনাথ সরকারকে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেলা বিএনপির অধীনে থাকা ২৩টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১৭টির সম্মেলন সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এছাড়া বেশ কয়েকটি ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলনই অনুষ্ঠিত হয়নি, যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ এবং সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের মধ্যে সাংগঠনিক নানা বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। গোদাগাড়ী-তানোর এলাকার ইউনিয়ন কমিটি গঠন এবং রাজশাহী-৫ আসনের ইউনিয়ন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যকার এই বিরোধ একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে। বিশ্বনাথ সরকার রাজশাহী-১ আসন এবং আবু সাঈদ চাঁদ রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় তাদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ে। তবে এই বিরোধের কথা অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকার দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই এবং কর্মীরা কেন এমন কথা বলছেন তা তার জানা নেই।

দ্রুত নতুন কমিটি গঠন না হলে নির্বাচনি মাঠে এর বড় ধাক্কা লাগবে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। নওহাটা পৌর যুবদলের নেতা মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় নির্বাচনে প্রচার ও ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক কার্যক্রমে যুবদলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় বিএনপি কর্মী রাসেদুল ইসলাম দলের দুঃসময়ে মামলা-হামলার মুখোমুখি হওয়া ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের নতুন কমিটিতে মূল্যায়নের দাবি জানান। তৃণমূলের আরেক নেতা ফিরোজ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় যোগ্য ও তরুণ নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আব্দুস সালাম নামে অপর এক নেতা সতর্ক করে বলেন, সক্রিয় নেতৃত্ব না থাকলে ভোটের মাঠে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

শুধু মূল দলই নয়, রাজশাহী জেলা যুবদলেও একই ধরনের সাংগঠনিক জটিলতা চলছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে মাসুদুর রহমান সজনকে আহ্বায়ক এবং রেজাউল করিম টুটুলকে সদস্যসচিব করে জেলা যুবদলের দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে মাত্র তিনটির কমিটি ঘোষণা করতে পেরেছে তারা, বাকি ইউনিটগুলো বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় পড়ে রয়েছে। অবশ্য বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক ও রাজশাহী-৬ আসনের এমপি আবু সাঈদ চাঁদ দাবি করেন, তাদের নেতৃত্বাধীন কমিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২৩টি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে এবং বাকিগুলোও দ্রুত শেষ করা হবে।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত দীর্ঘ এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সময় মামলা, হামলা ও গণগ্রেপ্তারের কারণে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন মনে করেন, শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় পর্যায়ে দলের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, রাজশাহী জেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের এই সাংগঠনিক জট দ্রুত না কাটলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটিকে বড় ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠাচ্ছে রাশিয়া

তিন মাসের কমিটি পার করল ৮ বছর, রাজশাহী জেলা বিএনপিতে ক্ষোভ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

তিন মাসের জন্য গঠিত রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে পূর্ণাঙ্গ বা নতুন কোনো আহ্বায়ক কমিটি গঠন না হওয়ায় থমকে গেছে দলীয় কার্যক্রম। নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এই দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক স্থবিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে।

২০১৯ সালের ৬ জুলাই কেন্দ্র থেকে রাজশাহী জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যের এই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সময় কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও দীর্ঘ প্রায় আট বছরেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এই কমিটিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সাঈদ চাঁদকে আহ্বায়ক এবং বিশ্বনাথ সরকারকে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেলা বিএনপির অধীনে থাকা ২৩টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১৭টির সম্মেলন সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এছাড়া বেশ কয়েকটি ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলনই অনুষ্ঠিত হয়নি, যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ এবং সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের মধ্যে সাংগঠনিক নানা বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। গোদাগাড়ী-তানোর এলাকার ইউনিয়ন কমিটি গঠন এবং রাজশাহী-৫ আসনের ইউনিয়ন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যকার এই বিরোধ একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে। বিশ্বনাথ সরকার রাজশাহী-১ আসন এবং আবু সাঈদ চাঁদ রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় তাদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ে। তবে এই বিরোধের কথা অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকার দাবি করেছেন, তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই এবং কর্মীরা কেন এমন কথা বলছেন তা তার জানা নেই।

দ্রুত নতুন কমিটি গঠন না হলে নির্বাচনি মাঠে এর বড় ধাক্কা লাগবে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। নওহাটা পৌর যুবদলের নেতা মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় নির্বাচনে প্রচার ও ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক কার্যক্রমে যুবদলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় বিএনপি কর্মী রাসেদুল ইসলাম দলের দুঃসময়ে মামলা-হামলার মুখোমুখি হওয়া ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের নতুন কমিটিতে মূল্যায়নের দাবি জানান। তৃণমূলের আরেক নেতা ফিরোজ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় যোগ্য ও তরুণ নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আব্দুস সালাম নামে অপর এক নেতা সতর্ক করে বলেন, সক্রিয় নেতৃত্ব না থাকলে ভোটের মাঠে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

শুধু মূল দলই নয়, রাজশাহী জেলা যুবদলেও একই ধরনের সাংগঠনিক জটিলতা চলছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে মাসুদুর রহমান সজনকে আহ্বায়ক এবং রেজাউল করিম টুটুলকে সদস্যসচিব করে জেলা যুবদলের দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে মাত্র তিনটির কমিটি ঘোষণা করতে পেরেছে তারা, বাকি ইউনিটগুলো বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় পড়ে রয়েছে। অবশ্য বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক ও রাজশাহী-৬ আসনের এমপি আবু সাঈদ চাঁদ দাবি করেন, তাদের নেতৃত্বাধীন কমিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২৩টি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে এবং বাকিগুলোও দ্রুত শেষ করা হবে।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত দীর্ঘ এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সময় মামলা, হামলা ও গণগ্রেপ্তারের কারণে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন মনে করেন, শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় পর্যায়ে দলের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, রাজশাহী জেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের এই সাংগঠনিক জট দ্রুত না কাটলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটিকে বড় ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।