লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশাহারা সাধারণ মানুষ: আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম

৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বাজারে গিয়ে মাছ ও মাংসের দাম শুনে অনেক ক্রেতাই খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্তানের পছন্দের খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। কোনো পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস পুরোপুরি বাদ পড়েছে, আবার কেউ এখন কেবল চাল, ডাল আর আলুর ওপর নির্ভর করে কোনোমতে টিকে আছেন। অনেক পরিবারে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ কেনার টাকাও জুটছে না। সংসার খরচ সামলাতে অনেকেই খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন অথবা প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা বাদ দিয়েছেন। তবু মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বল্প আয়ের মানুষ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, দ্রব্যমূল্যের এই চাপ কেবল বাজারের হিসাব নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সংকট। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের ব্যবসায়ও। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় তিন হাজার টাকায়। আয় কমে যাওয়ায় সংসার ও ব্যবসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রিফাত জানান, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসও কিছুটা ত্যাগ করতে হচ্ছে।

রাস্তার পাশের আরেক দোকানি মিজানের অবস্থা আরও করুণ। আগে সপ্তাহে এক-দুবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন সবজি কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। দৈনিক আয় ছয় থেকে সাতশ টাকা হলেও খরচ হচ্ছে সাত থেকে আটশ টাকা। ঘাটতি মেটাতে খাবারের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই তার। মিজান বলেন, নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছেন। সন্তানের আবদার পূরণ করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটাতে পারছেন না।

বাজারে বাড়তি খরচে দিশাহারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মধ্যবিত্তরাও। এক দম্পতি জানান, বাজারে ঢুকলেই অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই চলে যায় পাঁচশ টাকা। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতন হলে বাজারের খরচেই ব্যয় হয় অর্ধেকের বেশি। পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফ জানান, পণ্যের দাম বাড়ার একটি সহনীয় সীমা রয়েছে, যা পেরিয়ে গেলে জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদার সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, ক্রেতারা আগের মতো কেনাকাটা করছেন না। গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে পাইকারিতে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে পাম তেল কিনতেন, এখন তা ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মাছ বিক্রেতা শাকিল জানান, তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত, এখন শুধু সবজি কিনতেই পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়।

দিনমজুর আমীন আলীর জীবনেও সংকটের শেষ নেই। আগে একটি কাজ করে পাঁচ থেকে আটশ টাকা আয় করলেও এখন কাজ কম পান, পেলেও আয় হয় মাত্র চার-পাঁচশ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা হওয়ায় তা তার জন্য বিলাসিতা। তিনি বলেন, আগে মাসে দুইবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন একবারও পারেন না। তার মতে, চাল, ডাল, তেল ও আলুর দাম কমলেই তারা খুশি।

সংসারের টানাপোড়েনের নির্মম চিত্র তুলে ধরে এক মধ্যবয়স্ক বাবা জানান, গ্যাস না থাকায় কাঠের চুলা বা কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে। সন্তানের দুধ কেনার টাকা না থাকায় সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। সেলাইয়ের কাজ করা মিলন জানান, বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে কাজে পাঠিয়েছেন।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য নিম্ন আয়ের মানুষের নেই। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন খরচের কারণে দাম বাড়ে। তিনি দাবি করেন, ডিমের দাম বর্তমানে ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে এবং ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করছে। চালের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি কিনা, সে বিষয়েও অধিদপ্তর নজর রাখছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালী প্রেসক্লাবে সাংবাদিক লিয়াকত আলী খানের সুস্থতায় দোয়া মাহফিল

দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশাহারা সাধারণ মানুষ: আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:১৫:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। বাজারে গিয়ে মাছ ও মাংসের দাম শুনে অনেক ক্রেতাই খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্তানের পছন্দের খাবার কেনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না। কোনো পরিবারের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস পুরোপুরি বাদ পড়েছে, আবার কেউ এখন কেবল চাল, ডাল আর আলুর ওপর নির্ভর করে কোনোমতে টিকে আছেন। অনেক পরিবারে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ কেনার টাকাও জুটছে না। সংসার খরচ সামলাতে অনেকেই খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন অথবা প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা বাদ দিয়েছেন। তবু মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বল্প আয়ের মানুষ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, দ্রব্যমূল্যের এই চাপ কেবল বাজারের হিসাব নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সংকট। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের ব্যবসায়ও। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় তিন হাজার টাকায়। আয় কমে যাওয়ায় সংসার ও ব্যবসার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রিফাত জানান, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসও কিছুটা ত্যাগ করতে হচ্ছে।

রাস্তার পাশের আরেক দোকানি মিজানের অবস্থা আরও করুণ। আগে সপ্তাহে এক-দুবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন সবজি কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। দৈনিক আয় ছয় থেকে সাতশ টাকা হলেও খরচ হচ্ছে সাত থেকে আটশ টাকা। ঘাটতি মেটাতে খাবারের খরচ কমানো ছাড়া উপায় নেই তার। মিজান বলেন, নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছেন। সন্তানের আবদার পূরণ করা তো দূরের কথা, প্রয়োজনও ঠিকমতো মেটাতে পারছেন না।

বাজারে বাড়তি খরচে দিশাহারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মধ্যবিত্তরাও। এক দম্পতি জানান, বাজারে ঢুকলেই অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। কয়েক ধরনের সবজি কিনতেই চলে যায় পাঁচশ টাকা। মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতন হলে বাজারের খরচেই ব্যয় হয় অর্ধেকের বেশি। পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফ জানান, পণ্যের দাম বাড়ার একটি সহনীয় সীমা রয়েছে, যা পেরিয়ে গেলে জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদার সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, ক্রেতারা আগের মতো কেনাকাটা করছেন না। গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে পাইকারিতে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে পাম তেল কিনতেন, এখন তা ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মাছ বিক্রেতা শাকিল জানান, তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত, এখন শুধু সবজি কিনতেই পাঁচশ টাকা খরচ হয়ে যায়।

দিনমজুর আমীন আলীর জীবনেও সংকটের শেষ নেই। আগে একটি কাজ করে পাঁচ থেকে আটশ টাকা আয় করলেও এখন কাজ কম পান, পেলেও আয় হয় মাত্র চার-পাঁচশ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা হওয়ায় তা তার জন্য বিলাসিতা। তিনি বলেন, আগে মাসে দুইবার মাছ-মাংস খেতে পারলেও এখন একবারও পারেন না। তার মতে, চাল, ডাল, তেল ও আলুর দাম কমলেই তারা খুশি।

সংসারের টানাপোড়েনের নির্মম চিত্র তুলে ধরে এক মধ্যবয়স্ক বাবা জানান, গ্যাস না থাকায় কাঠের চুলা বা কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে। সন্তানের দুধ কেনার টাকা না থাকায় সাবু জ্বাল দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। সেলাইয়ের কাজ করা মিলন জানান, বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে কাজে পাঠিয়েছেন।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য নিম্ন আয়ের মানুষের নেই। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক গ্রাহক নিয়মিত গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন খরচের কারণে দাম বাড়ে। তিনি দাবি করেন, ডিমের দাম বর্তমানে ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে এবং ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করছে। চালের দাম নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি কিনা, সে বিষয়েও অধিদপ্তর নজর রাখছে।