লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিন্ধুতে শিশুদের মধ্যে এইচআইভি: ১৩০ জন আক্রান্ত, গাফিলতির প্রমাণ

পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে অন্তত ১৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানান, কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল এবং এর আশপাশের ১০ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, করাচির লান্ধি এলাকায় সিন্ধু এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত আরেকটি কেন্দ্রে আলাদা পরীক্ষায় আরও ১০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়। সেসি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সংস্থা, যা সিন্ধু প্রদেশজুড়ে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিক এবং তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

কেবিভি হাসপাতালের এই সংকট প্রথম সবার নজরে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন করাচির ‘সাইট টাউন’ এলাকার বাসিন্দারা খেয়াল করেন যে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কয়েকজন শিশু একসঙ্গে সংক্রমিত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা এই সংক্রমণের শুরুটা ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে হিসাব করছেন, যখন প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে প্রথমবারের মতো ছয়জন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর তথ্য আসে।

গত ১৪ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দুটি তদন্তের বিষয়ে জানানো হয়, যেখানে বড় ধরনের বেশ কিছু গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মকানুন ঠিকমতো না মানা, সুরক্ষাসামগ্রীর অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) সিরিঞ্জ যথাযথভাবে ব্যবহার না করা। গত বছরের নভেম্বরে জমা দেওয়া প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬ জন শিশুর শরীরে এইচআইভি শনাক্তের কথা ছিল, যারা সবাই কেবিভি হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছিল। এরপর গত ১৯ জুন প্রাদেশিক ন্যায়পালের কাছে জমা দেওয়া দ্বিতীয় ও আরও বিস্তারিত প্রতিবেদনে ৭৮ জনের আক্রান্ত হওয়া এবং ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এই প্রতিবেদনে প্রশাসনিক ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের নির্দিষ্ট কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে। এরপর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা কেবলই বেড়েছে।

শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, আক্রান্ত সব রোগীই ২০২৫ সালের অক্টোবরের আগে সংক্রমিত হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন রোগী পাওয়া যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে।’ এই ঘটনায় নিজের ‘পরোক্ষ দায়’ স্বীকার করে মন্ত্রী সাঈদ গনি বলেন, এমনকি পদত্যাগ করলে যদি এই সংকটের সমাধান হয়, তবে তাতেও তাঁর আপত্তি নেই। গত ৩ জুলাই হাসপাতালটির ৩৭ জন চিকিৎসক ও কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে এবং জবাব দেওয়ার জন্য তাঁদের ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সাঈদ গনি জানান, তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে এবং চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হবে।

সিন্ধু হাইকোর্টে করা এক রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের কারণেই এইচআইভি ছড়িয়েছে। তবে ৪ জুলাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গনি দাবি করেন, সংক্রমণ সিরিঞ্জের পুনর্ব্যবহারের কারণে ঘটেনি। তাঁর যুক্তি ছিল, কেবিভি হাসপাতালে ‘অটো-ডিজেবল’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকেজো হয়ে যাওয়া সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়, যা দ্বিতীয়বার ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রীর দাবির বিপরীত কথা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধের পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল। রিট আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, সরকারিভাবে যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।

সিন্ধু প্রদেশে বড় পরিসরে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএনএইডস পাকিস্তানের এই সংকটকে ডব্লিউএইচওর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এইচআইভি মহামারিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অঞ্চলে ২১টি দেশ রয়েছে। গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণের হার ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে এসে ৪৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গত ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে সংস্থা দুটি একটি যৌথ বিবৃতি দেয়, যেখানে ধারণা দেওয়া হয়, পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তাঁরা আক্রান্ত। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হারও বেড়েছে। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৩০, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে। এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছে। অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঠেকাতে থেরাপি প্রয়োজন এমন গর্ভবতী নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ এই সেবা পান।

গত জুনে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট এইচআইভি’-তে চিকিৎসকেরা একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তাঁরা যুক্তি দেন, পাকিস্তানের এই মহামারি এখন ‘বড় অংশে চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমেই’ ছড়িয়ে পড়ছে। অনিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতির কারণে বারবার এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। তবে এই মূল্যায়ন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। বারবার এই প্রাদুর্ভাবের কারণে চিকিৎসাব্যবস্থার অনিরাপদ দিকগুলো সামনে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে বিস্তৃত নজরদারিব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। যৌন মিলন, মায়ের থেকে শিশুতে সংক্রমণ কিংবা শিরায় মাদক নেওয়ার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে দেশজুড়ে ঠিক কতজন এইচআইভিতে সংক্রমিত হচ্ছেন, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

করাচির আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ ফয়সাল মাহমুদ এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। অধ্যাপক ফয়সাল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ঠিক কোনটি, তা নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্লিনিক, হাসপাতাল বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে কত মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তা পর্যবেক্ষণের জন্য কাঠামোগত কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নেই।’

এই প্রবণতা শুধু কেবিভি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। করাচির আরও তিনটি হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি হাসপাতালে ২০২৪ সালে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছিল ১০ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিন্ধু প্রদেশে ৮৯৪ জন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ৩২৯ জনই শিশু। এ বিষয়ে গত এপ্রিলে সতর্ক করে পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলেছিল, এই পরিসংখ্যানটি মূলত ‘হিমশৈলের চূড়া মাত্র’। ফয়সাল মাহমুদের মতে, এসব ঘটনা আরও বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরেই ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে আছে। শুধু শিশুরাই এর শিকার হচ্ছে না বলেও জানান ফয়সাল। তিনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলোতে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কারণে ঘটা প্রাদুর্ভাবের দিকেও ইঙ্গিত করেন। হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায়ও বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর একটি পাকিস্তান, এবং ফয়সাল মাহমুদ বলেন, বর্তমানে এইচআইভি ছড়ানোর পেছনে যেসব কারণ বা পদ্ধতি কাজ করছে, ঠিক একই কারণে হেপাটাইটিস সি-ও ছড়াচ্ছে।

সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ ও ফেলার ক্ষেত্রে প্রাদেশিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে একটি আবেদন করা হয়েছিল। এর জন্য সিন্ধু হাইকোর্ট প্রাদেশিক সরকারকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ৩ জুলাই সারা দেশে মানহীন সিরিঞ্জ ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটি অব পাকিস্তান পরে জানায়, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুস্তাফা কামাল বলেছেন, সারা দেশে যেকোনো অস্ত্রোপচারের আগে এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে বড় পরিসরে ‘মহামারি’ বলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

এদিকে প্রাদেশিক ন্যায়পাল বিষয়টি নজরে নেওয়ার পর সিন্ধু সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপির (৭২ লাখ মার্কিন ডলার) একটি তহবিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং কেবিভি হাসপাতালের কেনাকাটা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি) নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে ফয়সাল মাহমুদ বলেন, সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলো এই সমস্যার আংশিক সমাধান মাত্র। তাঁর মতে, পাকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি খাত। আর এই খাতকে নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারিতে রাখাটা অনেক বেশি কঠিন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘চিকিৎসকের কাছে এলে রোগীরা আশা করেন যে তাঁদের ইনজেকশন দেওয়া হবে। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, এতে তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরাও এমনটাই ভাবেন।’ ফয়সালের ভাষায়, ‘সব মিলিয়ে এটি যেন একটি বড় বিপর্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রচুর ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে, এসবের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, নিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত, ঠিকমতো ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে কি না, তার কোনো নজরদারি নেই এবং অনিরাপদ চর্চার জন্য কাউকে শাস্তির মুখেও পড়তে হয় না।’

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবার ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সিন্ধুতে শিশুদের মধ্যে এইচআইভি: ১৩০ জন আক্রান্ত, গাফিলতির প্রমাণ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩২:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে অন্তত ১৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানান, কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল এবং এর আশপাশের ১০ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, করাচির লান্ধি এলাকায় সিন্ধু এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত আরেকটি কেন্দ্রে আলাদা পরীক্ষায় আরও ১০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়। সেসি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সংস্থা, যা সিন্ধু প্রদেশজুড়ে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিক এবং তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

কেবিভি হাসপাতালের এই সংকট প্রথম সবার নজরে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন করাচির ‘সাইট টাউন’ এলাকার বাসিন্দারা খেয়াল করেন যে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কয়েকজন শিশু একসঙ্গে সংক্রমিত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা এই সংক্রমণের শুরুটা ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে হিসাব করছেন, যখন প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে প্রথমবারের মতো ছয়জন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর তথ্য আসে।

গত ১৪ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দুটি তদন্তের বিষয়ে জানানো হয়, যেখানে বড় ধরনের বেশ কিছু গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মকানুন ঠিকমতো না মানা, সুরক্ষাসামগ্রীর অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) সিরিঞ্জ যথাযথভাবে ব্যবহার না করা। গত বছরের নভেম্বরে জমা দেওয়া প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬ জন শিশুর শরীরে এইচআইভি শনাক্তের কথা ছিল, যারা সবাই কেবিভি হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছিল। এরপর গত ১৯ জুন প্রাদেশিক ন্যায়পালের কাছে জমা দেওয়া দ্বিতীয় ও আরও বিস্তারিত প্রতিবেদনে ৭৮ জনের আক্রান্ত হওয়া এবং ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এই প্রতিবেদনে প্রশাসনিক ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের নির্দিষ্ট কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে। এরপর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা কেবলই বেড়েছে।

শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, আক্রান্ত সব রোগীই ২০২৫ সালের অক্টোবরের আগে সংক্রমিত হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন রোগী পাওয়া যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে।’ এই ঘটনায় নিজের ‘পরোক্ষ দায়’ স্বীকার করে মন্ত্রী সাঈদ গনি বলেন, এমনকি পদত্যাগ করলে যদি এই সংকটের সমাধান হয়, তবে তাতেও তাঁর আপত্তি নেই। গত ৩ জুলাই হাসপাতালটির ৩৭ জন চিকিৎসক ও কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে এবং জবাব দেওয়ার জন্য তাঁদের ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সাঈদ গনি জানান, তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে এবং চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হবে।

সিন্ধু হাইকোর্টে করা এক রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের কারণেই এইচআইভি ছড়িয়েছে। তবে ৪ জুলাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গনি দাবি করেন, সংক্রমণ সিরিঞ্জের পুনর্ব্যবহারের কারণে ঘটেনি। তাঁর যুক্তি ছিল, কেবিভি হাসপাতালে ‘অটো-ডিজেবল’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকেজো হয়ে যাওয়া সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়, যা দ্বিতীয়বার ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনগুলো মন্ত্রীর দাবির বিপরীত কথা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধের পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল। রিট আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, সরকারিভাবে যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।

সিন্ধু প্রদেশে বড় পরিসরে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএনএইডস পাকিস্তানের এই সংকটকে ডব্লিউএইচওর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এইচআইভি মহামারিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অঞ্চলে ২১টি দেশ রয়েছে। গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণের হার ২০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সালে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে এসে ৪৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গত ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে সংস্থা দুটি একটি যৌথ বিবৃতি দেয়, যেখানে ধারণা দেওয়া হয়, পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জানেনই না যে তাঁরা আক্রান্ত। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হারও বেড়েছে। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৩০, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে। এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছে। অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঠেকাতে থেরাপি প্রয়োজন এমন গর্ভবতী নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ এই সেবা পান।

গত জুনে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট এইচআইভি’-তে চিকিৎসকেরা একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তাঁরা যুক্তি দেন, পাকিস্তানের এই মহামারি এখন ‘বড় অংশে চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমেই’ ছড়িয়ে পড়ছে। অনিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতির কারণে বারবার এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন। তবে এই মূল্যায়ন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। বারবার এই প্রাদুর্ভাবের কারণে চিকিৎসাব্যবস্থার অনিরাপদ দিকগুলো সামনে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে বিস্তৃত নজরদারিব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। যৌন মিলন, মায়ের থেকে শিশুতে সংক্রমণ কিংবা শিরায় মাদক নেওয়ার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে দেশজুড়ে ঠিক কতজন এইচআইভিতে সংক্রমিত হচ্ছেন, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

করাচির আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ ফয়সাল মাহমুদ এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। অধ্যাপক ফয়সাল আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ঠিক কোনটি, তা নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্লিনিক, হাসপাতাল বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে কত মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তা পর্যবেক্ষণের জন্য কাঠামোগত কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নেই।’

এই প্রবণতা শুধু কেবিভি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। করাচির আরও তিনটি হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি হাসপাতালে ২০২৪ সালে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছিল ১০ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিন্ধু প্রদেশে ৮৯৪ জন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ৩২৯ জনই শিশু। এ বিষয়ে গত এপ্রিলে সতর্ক করে পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলেছিল, এই পরিসংখ্যানটি মূলত ‘হিমশৈলের চূড়া মাত্র’। ফয়সাল মাহমুদের মতে, এসব ঘটনা আরও বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরেই ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে আছে। শুধু শিশুরাই এর শিকার হচ্ছে না বলেও জানান ফয়সাল। তিনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলোতে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কারণে ঘটা প্রাদুর্ভাবের দিকেও ইঙ্গিত করেন। হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায়ও বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর একটি পাকিস্তান, এবং ফয়সাল মাহমুদ বলেন, বর্তমানে এইচআইভি ছড়ানোর পেছনে যেসব কারণ বা পদ্ধতি কাজ করছে, ঠিক একই কারণে হেপাটাইটিস সি-ও ছড়াচ্ছে।

সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ ও ফেলার ক্ষেত্রে প্রাদেশিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে একটি আবেদন করা হয়েছিল। এর জন্য সিন্ধু হাইকোর্ট প্রাদেশিক সরকারকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ৩ জুলাই সারা দেশে মানহীন সিরিঞ্জ ব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটি অব পাকিস্তান পরে জানায়, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুস্তাফা কামাল বলেছেন, সারা দেশে যেকোনো অস্ত্রোপচারের আগে এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে বড় পরিসরে ‘মহামারি’ বলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

এদিকে প্রাদেশিক ন্যায়পাল বিষয়টি নজরে নেওয়ার পর সিন্ধু সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপির (৭২ লাখ মার্কিন ডলার) একটি তহবিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং কেবিভি হাসপাতালের কেনাকাটা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি) নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে ফয়সাল মাহমুদ বলেন, সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলো এই সমস্যার আংশিক সমাধান মাত্র। তাঁর মতে, পাকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি খাত। আর এই খাতকে নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারিতে রাখাটা অনেক বেশি কঠিন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘চিকিৎসকের কাছে এলে রোগীরা আশা করেন যে তাঁদের ইনজেকশন দেওয়া হবে। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, এতে তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরাও এমনটাই ভাবেন।’ ফয়সালের ভাষায়, ‘সব মিলিয়ে এটি যেন একটি বড় বিপর্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রচুর ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে, এসবের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, নিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত, ঠিকমতো ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে কি না, তার কোনো নজরদারি নেই এবং অনিরাপদ চর্চার জন্য কাউকে শাস্তির মুখেও পড়তে হয় না।’