লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়াকৈরের মাহমুদা প্রতিবন্ধী স্কুল: এক মায়ের অনন্য উদ্যোগ

আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও শিক্ষার পথ এখনো নানা সামাজিক অবহেলা ও প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংবেদনশীলতার অভাবে অনেক ব্যবস্থার মাঝেই এসব শিশুকে ঘরের কোণে বন্দিজীবন কাটাতে হয়। এই বৈরী বাস্তবতার বিপরীতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গড়ে ওঠা ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’ এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তানকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হয়ে শামছুন্নাহার কবির নামের এক সংগ্রামী মা যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তা আজ ৮০ জন বিশেষ শিশুর বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।

এই মহতী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার একটি ভাড়া বাসায়, মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়টি এখন নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন লাভ করেছে। বর্তমানে এখানে নিয়োজিত পাঁচজন শিক্ষক সাধারণ পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কুটিরশিল্প, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ করে তুলছেন। সবচেয়ে বড় সাফল্যের বিষয় হলো, এই বিদ্যালয়ের ২০ জন শিক্ষার্থীকে ইতিমধ্যে তাদের উপযোগী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হয়েছে।

কালিয়াকৈরের এই অসাধারণ সাফল্য যেমন আমাদের আশাবাদী করে, তেমনি দেশের সার্বিক বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে। দেশের বহু উপজেলায় এখনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য কোনো সরকারি বা সমন্বিত বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে শামছুন্নাহার কবিরের মতো সংবেদনশীল মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগই প্রান্তিক পরিবারগুলোর একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে কেবল ব্যক্তি উদ্যোগ বা স্থানীয় অনুদানের ওপর নির্ভর করে জাতীয় পর্যায়ে একটি টেকসই ও সর্বজনীন বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

বিদ্যালয়টিতে সরকারি বই বিতরণ, ভাতা প্রদান ও প্রশাসনিক তদারকি বজায় রাখা এবং গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই রাষ্ট্রীয় সহায়তাকে কেবল ভাতা বা উপহারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এসব বিশেষায়িত স্কুলের জন্য মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও আধুনিক থেরাপির উপকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী অবকাঠামোগত বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক, মানবিক ও সাংবিধানিক অধিকার। তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে কালিয়াকৈরের এই মডেলকে সারা দেশে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

নোয়াখালীতে তরুণীদের আটকে পর্নোগ্রাফি তৈরির অভিযোগে ৫ জন গ্রেপ্তার

কালিয়াকৈরের মাহমুদা প্রতিবন্ধী স্কুল: এক মায়ের অনন্য উদ্যোগ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও শিক্ষার পথ এখনো নানা সামাজিক অবহেলা ও প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংবেদনশীলতার অভাবে অনেক ব্যবস্থার মাঝেই এসব শিশুকে ঘরের কোণে বন্দিজীবন কাটাতে হয়। এই বৈরী বাস্তবতার বিপরীতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গড়ে ওঠা ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’ এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তানকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হয়ে শামছুন্নাহার কবির নামের এক সংগ্রামী মা যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তা আজ ৮০ জন বিশেষ শিশুর বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।

এই মহতী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার একটি ভাড়া বাসায়, মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়টি এখন নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন লাভ করেছে। বর্তমানে এখানে নিয়োজিত পাঁচজন শিক্ষক সাধারণ পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কুটিরশিল্প, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ করে তুলছেন। সবচেয়ে বড় সাফল্যের বিষয় হলো, এই বিদ্যালয়ের ২০ জন শিক্ষার্থীকে ইতিমধ্যে তাদের উপযোগী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করা সম্ভব হয়েছে।

কালিয়াকৈরের এই অসাধারণ সাফল্য যেমন আমাদের আশাবাদী করে, তেমনি দেশের সার্বিক বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে। দেশের বহু উপজেলায় এখনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য কোনো সরকারি বা সমন্বিত বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে শামছুন্নাহার কবিরের মতো সংবেদনশীল মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগই প্রান্তিক পরিবারগুলোর একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে কেবল ব্যক্তি উদ্যোগ বা স্থানীয় অনুদানের ওপর নির্ভর করে জাতীয় পর্যায়ে একটি টেকসই ও সর্বজনীন বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

বিদ্যালয়টিতে সরকারি বই বিতরণ, ভাতা প্রদান ও প্রশাসনিক তদারকি বজায় রাখা এবং গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই রাষ্ট্রীয় সহায়তাকে কেবল ভাতা বা উপহারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এসব বিশেষায়িত স্কুলের জন্য মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও আধুনিক থেরাপির উপকরণ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী অবকাঠামোগত বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক, মানবিক ও সাংবিধানিক অধিকার। তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে কালিয়াকৈরের এই মডেলকে সারা দেশে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।