লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিষ্টি ও গাজী নজরুলের আগে যেসব বিতর্কিত এমপির আসন শূন্য হয়েছিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হয়েছে প্রায় সাত মাস আগে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন দুজন সংসদ সদস্য, যাদের পরিণতি হয়েছে দুই রকম। জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদটি এখনো বহাল আছে। অন্যদিকে, ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসার পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। দলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এই পদত্যাগপত্র জমা দেন।

সংসদ সদস্যদের বিতর্কে জড়ানো এবং এর জেরে আসন শূন্য হওয়া কিংবা দল থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা দেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন কারণে অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার নজির রয়েছে। এছাড়া দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্য, যদিও দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা তৈরি হয়নি। তবে দলবদল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে অতীতে অন্তত তিনজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে।

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের আসন কখন ও কী কারণে শূন্য হবে, তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নিতে ব্যর্থ হওয়া; সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ কার্যদিবস অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকা; সংসদ ভেঙে যাওয়া; আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া; দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পাওয়া; কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করা অথবা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া।

এছাড়া ১৯৭২ সালের দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীনে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে, প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে কিংবা কোনো আইনের দ্বারা নির্বাচনের অযোগ্য হলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। এর বাইরে কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে নিজের দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। পাশাপাশি কোনো সংসদ সদস্য চাইলে স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন।

অতীতের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়েন। এর জেরে ওই বছরের ১২ অক্টোবর তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিন তাঁর দলীয় সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করা হয়। পরে ২৪ অক্টোবর তাঁকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। দেশে ফেরার পর নভেম্বরে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের শুনানির একপর্যায়ে লতিফ সিদ্দিকী জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ইচ্ছার’ কথা উল্লেখ করে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান। একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, যেখানে তিনি এক চিত্রনায়িকাকে হুমকি ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি এবং মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন।

এর আগে ২০১৩ সালে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুজন সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় কারাগারে যেতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে। পরবর্তীতে তিনি দলের মনোনয়ন পাননি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল। বিপুল অর্থের বিনিময়ে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশের মাটিতে দণ্ডিত হওয়ার প্রথম ঘটনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির আবুল কাশেমকে ‘ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি’ উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। সোনালী ব্যাংকে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৭ টাকা ঋণ এবং ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩২ হাজার ১১০ টাকা ফোন বিল বকেয়া থাকায় হাইকোর্ট আবুল কাশেমের গেজেট অবৈধ ঘোষণা করেন। ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ তাঁর আপিল খারিজ করে দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।

একইভাবে ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীর ২০০৮ সালের নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিজয়ী হন। দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার অভিযোগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে দায়ের করা মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) জসিমউদ্দিনকে ২০০৪ সালের আগস্টে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন আইন অনুযায়ী অবসর গ্রহণের ৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বর্তমান সংসদের স্পিকার) উচ্চ আদালতে রিট করেন। আইনি লড়াই শেষে আদালত জসিমউদ্দিনের সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য করে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের তিনটি বড় নজির রয়েছে। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ২০০০ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় তাঁর আসন শূন্য হয়। ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জ-৭ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হাসিবুর রহমান (স্বপন) দল থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপমন্ত্রী হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। একইভাবে রাজশাহী-৫ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হওয়ায় তাঁর আসন শূন্য হয়। তবে পরে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি আবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

সংবিধানে সরাসরি এমন কোনো বিধান নেই যে রাজনৈতিক দল কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন স্পিকার। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার ঘটনাও কম নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ (মৌলভীবাজার-২) জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ শপথ নিলে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইভাবে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান ২৫ এপ্রিল শপথ নিলে তাঁকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। পরবর্তীতে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েও শপথ নেননি এবং তাঁর আসনে উপনির্বাচনে জিতে শপথ নেন বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। একপর্যায়ে জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশও তুলে নেওয়া হয়।

অনুরূপভাবে, ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজাকে ২০১২ সালের অক্টোবরে জীবনবৃত্তান্তে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। ২০০১-০৬ মেয়াদে রাজশাহী-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির আবু হেনা ২০০৫ সালে নিজ এলাকার মানুষ উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চলতি অর্থবছরেই ২০ জেলায় সমন্বিত অক্সিজেন প্রকল্প বাস্তবায়ন: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

মিষ্টি ও গাজী নজরুলের আগে যেসব বিতর্কিত এমপির আসন শূন্য হয়েছিল

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:২৩:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হয়েছে প্রায় সাত মাস আগে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন দুজন সংসদ সদস্য, যাদের পরিণতি হয়েছে দুই রকম। জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদটি এখনো বহাল আছে। অন্যদিকে, ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসার পর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। দলের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এই পদত্যাগপত্র জমা দেন।

সংসদ সদস্যদের বিতর্কে জড়ানো এবং এর জেরে আসন শূন্য হওয়া কিংবা দল থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা দেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন কারণে অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার নজির রয়েছে। এছাড়া দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্য, যদিও দল থেকে বহিষ্কারের কারণে তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা তৈরি হয়নি। তবে দলবদল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের কারণে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে অতীতে অন্তত তিনজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে।

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের আসন কখন ও কী কারণে শূন্য হবে, তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নিতে ব্যর্থ হওয়া; সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ কার্যদিবস অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকা; সংসদ ভেঙে যাওয়া; আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া; দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পাওয়া; কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করা অথবা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া।

এছাড়া ১৯৭২ সালের দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীনে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে, প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে কিংবা কোনো আইনের দ্বারা নির্বাচনের অযোগ্য হলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হতে পারে। এর বাইরে কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে নিজের দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হয়ে যায়। পাশাপাশি কোনো সংসদ সদস্য চাইলে স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারেন।

অতীতের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়েন। এর জেরে ওই বছরের ১২ অক্টোবর তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই দিন তাঁর দলীয় সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করা হয়। পরে ২৪ অক্টোবর তাঁকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। দেশে ফেরার পর নভেম্বরে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের শুনানির একপর্যায়ে লতিফ সিদ্দিকী জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ইচ্ছার’ কথা উল্লেখ করে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান। একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, যেখানে তিনি এক চিত্রনায়িকাকে হুমকি ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেননি এবং মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন।

এর আগে ২০১৩ সালে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুজন সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় কারাগারে যেতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে। পরবর্তীতে তিনি দলের মনোনয়ন পাননি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল। বিপুল অর্থের বিনিময়ে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশের মাটিতে দণ্ডিত হওয়ার প্রথম ঘটনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ সচিবালয় তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির আবুল কাশেমকে ‘ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি’ উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। সোনালী ব্যাংকে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৭ টাকা ঋণ এবং ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩২ হাজার ১১০ টাকা ফোন বিল বকেয়া থাকায় হাইকোর্ট আবুল কাশেমের গেজেট অবৈধ ঘোষণা করেন। ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ তাঁর আপিল খারিজ করে দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়।

একইভাবে ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীর ২০০৮ সালের নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিজয়ী হন। দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার অভিযোগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে দায়ের করা মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের মেজর (অব.) জসিমউদ্দিনকে ২০০৪ সালের আগস্টে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন আইন অনুযায়ী অবসর গ্রহণের ৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বর্তমান সংসদের স্পিকার) উচ্চ আদালতে রিট করেন। আইনি লড়াই শেষে আদালত জসিমউদ্দিনের সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য করে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের তিনটি বড় নজির রয়েছে। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ২০০০ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় তাঁর আসন শূন্য হয়। ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জ-৭ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত হাসিবুর রহমান (স্বপন) দল থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপমন্ত্রী হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। একইভাবে রাজশাহী-৫ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হওয়ায় তাঁর আসন শূন্য হয়। তবে পরে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি আবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

সংবিধানে সরাসরি এমন কোনো বিধান নেই যে রাজনৈতিক দল কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন স্পিকার। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার ঘটনাও কম নয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ (মৌলভীবাজার-২) জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ শপথ নিলে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইভাবে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান ২৫ এপ্রিল শপথ নিলে তাঁকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু তাঁদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। পরবর্তীতে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েও শপথ নেননি এবং তাঁর আসনে উপনির্বাচনে জিতে শপথ নেন বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। একপর্যায়ে জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশও তুলে নেওয়া হয়।

অনুরূপভাবে, ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজাকে ২০১২ সালের অক্টোবরে জীবনবৃত্তান্তে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। ২০০১-০৬ মেয়াদে রাজশাহী-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির আবু হেনা ২০০৫ সালে নিজ এলাকার মানুষ উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলায় দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তবে তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে আবু হেনার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে।