লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও নেই জিয়া: জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা ও রিজভীর প্রশ্ন

জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত একটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রাখা হলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি বা তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণার উল্লেখ না থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে। গত ৫ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি শনিবার শেষ হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতি নিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ব্যাখ্যা দিলেও তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়ে গেছে।

প্রদর্শনীটিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহকে ছয়টি আলাদা অংশে তুলে ধরা হয়। প্রথম অংশ ‘আজাদী, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’-এ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইতিহাস দেখানো হয়, যেখানে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে একনায়ক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশ ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর শুরুতেই রাখা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। এই অংশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ, জেনারেল নিয়াজির রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের চিত্র রয়েছে। তৃতীয় অংশ ‘একনায়কতন্ত্র’-এ শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর দেশে ফেরা, পারিবারিক ভোজ, ১৯৭২ সালে ভারতীয় বাহিনীর বিদায়ী প্যারেড, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও রক্ষীবাহিনীর তাণ্ডব এবং ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার চিত্র দেখানো হয়েছে। এই অংশেই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার চিত্রও স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীর চতুর্থ অংশ ‘সামরিক স্বৈরশাসন’-এ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরশাসক হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও জামায়াতের বর্তমান নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের অংশগ্রহণের ছবি রাখা হয়েছে। পঞ্চম অংশ ‘ফ্যাসিবাদ’-এ ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ স্থান পেয়েছে। সর্বশেষ ষষ্ঠ অংশ ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান’-এ শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম এবং আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদসহ আহত ও সাধারণ মানুষের ছবি স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের একাধিক ছবি থাকলেও জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি না থাকার বিষয়ে শনিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে প্রদর্শনী পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এখানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ আছে, কিন্তু জিয়াউর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নেই কেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান তো অটোক্র্যাট বা স্বৈরশাসক ছিলেন না, তাই তাঁর ছবি এখানে আনা হয়নি। শফিকুর রহমান দাবি করেন, যারা কর্তৃত্ববাদী, আগ্রাসী ও জুলুমবাজ ছিল, কেবল তাদেরই এই প্রদর্শনীতে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কোনো সরকারের সফলতা দেখানো নয়, বরং যুগে যুগে স্বৈরাচারদের হাতে জনগণ কীভাবে নিগৃহীত হয়েছে তা শহীদ পরিবারের প্রত্যাশার আলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসে যাঁর কল্যাণকর অবদান রয়েছে, তাঁর প্রতি জামায়াত গভীর শ্রদ্ধাশীল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে জামায়াত আমিরের এই ব্যাখ্যার পরও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, প্রদর্শনীতে কেবল স্বৈরশাসকদেরই তুলে ধরা হয়নি, কারণ সেখানে বেগম খালেদা জিয়া এবং জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের ছবিও রয়েছে। এদিকে, শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই প্রদর্শনীর সমালোচনা করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, জামায়াত আমিরের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের ছবি থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি, কথা বা পোস্টার না রাখা অত্যন্ত রহস্যজনক।

কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার আগে ও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ইতিবাচক ও নেতিবাচক’—দুই ধরনের ভূমিকাই তুলে ধরেছে।যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবির ওপরে জামায়াত লিখেছে, ‘৭ মার্চ ১৯৭১; রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান’।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও নেই জিয়া: জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা ও রিজভীর প্রশ্ন

প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও নেই জিয়া: জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা ও রিজভীর প্রশ্ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০০:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত একটি স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রাখা হলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি বা তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণার উল্লেখ না থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে। গত ৫ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি শনিবার শেষ হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতি নিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ব্যাখ্যা দিলেও তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়ে গেছে।

প্রদর্শনীটিতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহকে ছয়টি আলাদা অংশে তুলে ধরা হয়। প্রথম অংশ ‘আজাদী, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’-এ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইতিহাস দেখানো হয়, যেখানে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে একনায়ক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশ ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর শুরুতেই রাখা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। এই অংশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ, জেনারেল নিয়াজির রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের চিত্র রয়েছে। তৃতীয় অংশ ‘একনায়কতন্ত্র’-এ শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর দেশে ফেরা, পারিবারিক ভোজ, ১৯৭২ সালে ভারতীয় বাহিনীর বিদায়ী প্যারেড, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও রক্ষীবাহিনীর তাণ্ডব এবং ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার চিত্র দেখানো হয়েছে। এই অংশেই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার চিত্রও স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীর চতুর্থ অংশ ‘সামরিক স্বৈরশাসন’-এ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরশাসক হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও জামায়াতের বর্তমান নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের অংশগ্রহণের ছবি রাখা হয়েছে। পঞ্চম অংশ ‘ফ্যাসিবাদ’-এ ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতন পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ স্থান পেয়েছে। সর্বশেষ ষষ্ঠ অংশ ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান’-এ শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম এবং আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদসহ আহত ও সাধারণ মানুষের ছবি স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের একাধিক ছবি থাকলেও জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি না থাকার বিষয়ে শনিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে প্রদর্শনী পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এখানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ আছে, কিন্তু জিয়াউর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নেই কেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান তো অটোক্র্যাট বা স্বৈরশাসক ছিলেন না, তাই তাঁর ছবি এখানে আনা হয়নি। শফিকুর রহমান দাবি করেন, যারা কর্তৃত্ববাদী, আগ্রাসী ও জুলুমবাজ ছিল, কেবল তাদেরই এই প্রদর্শনীতে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কোনো সরকারের সফলতা দেখানো নয়, বরং যুগে যুগে স্বৈরাচারদের হাতে জনগণ কীভাবে নিগৃহীত হয়েছে তা শহীদ পরিবারের প্রত্যাশার আলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসে যাঁর কল্যাণকর অবদান রয়েছে, তাঁর প্রতি জামায়াত গভীর শ্রদ্ধাশীল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে জামায়াত আমিরের এই ব্যাখ্যার পরও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, প্রদর্শনীতে কেবল স্বৈরশাসকদেরই তুলে ধরা হয়নি, কারণ সেখানে বেগম খালেদা জিয়া এবং জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের ছবিও রয়েছে। এদিকে, শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই প্রদর্শনীর সমালোচনা করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, জামায়াত আমিরের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের ছবি থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি, কথা বা পোস্টার না রাখা অত্যন্ত রহস্যজনক।

কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার আগে ও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ইতিবাচক ও নেতিবাচক’—দুই ধরনের ভূমিকাই তুলে ধরেছে।যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবির ওপরে জামায়াত লিখেছে, ‘৭ মার্চ ১৯৭১; রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান’।