লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের খসড়া: কী থাকছে নতুন আইনে

বাংলাদেশে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই আইনের খসড়া প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে এই খসড়ার ওপর বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিবর্তন এনে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ভেটিং শেষে বিলটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। সংসদে বিলটি পাস হলেই কেবল র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র‍্যাব গঠিত হয়। শুরু থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের মুখে থাকা এই বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ৩৮০ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে টেকনাফের মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৮ সালে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়, যার প্রধান ছিলেন বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে কাজ করবে। এতে পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে, তবে নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও অস্থায়ীভাবে সংযুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এসআরবির দায়িত্বের তালিকায় রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন। এছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গুম, খুন এবং ভূমিদস্যুতা রোধেও এসআরবি কাজ করবে।

খসড়ায় এসআরবিকে তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হলেও ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। কোনো সদস্য কাউকে গ্রেপ্তার করলে বা আলামত জব্দ করলে তা অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তরের নির্দেশ রয়েছে। এছাড়া বাহিনীর শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতে রাখা হয়েছে। নাগরিক অভিযোগ প্রতিকারের জন্য ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান দল গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।

এই প্রস্তাব নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, এটি কেবল পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা। তিনি মনে করেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাজের ধরণ ভিন্ন হওয়ায় এসআরবিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করার সুযোগ রাখাটা যৌক্তিক নয়। অন্যদিকে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা প্রদান এবং নাগরিকদের অভিযোগের সুযোগ রাখা র‍্যাবের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে খসড়ায় মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে দ্রুত অভিযান পরিচালনার বিস্তারিত নীতিমালা অনুপস্থিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও নেই জিয়া: জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা ও রিজভীর প্রশ্ন

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের খসড়া: কী থাকছে নতুন আইনে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:২৪:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই আইনের খসড়া প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে এই খসড়ার ওপর বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিবর্তন এনে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ভেটিং শেষে বিলটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। সংসদে বিলটি পাস হলেই কেবল র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র‍্যাব গঠিত হয়। শুরু থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের মুখে থাকা এই বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যমতে, বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ৩৮০ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে টেকনাফের মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৮ সালে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়, যার প্রধান ছিলেন বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে কাজ করবে। এতে পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে, তবে নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও অস্থায়ীভাবে সংযুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এসআরবির দায়িত্বের তালিকায় রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন। এছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গুম, খুন এবং ভূমিদস্যুতা রোধেও এসআরবি কাজ করবে।

খসড়ায় এসআরবিকে তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হলেও ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। কোনো সদস্য কাউকে গ্রেপ্তার করলে বা আলামত জব্দ করলে তা অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তরের নির্দেশ রয়েছে। এছাড়া বাহিনীর শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতে রাখা হয়েছে। নাগরিক অভিযোগ প্রতিকারের জন্য ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান দল গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।

এই প্রস্তাব নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, এটি কেবল পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা। তিনি মনে করেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাজের ধরণ ভিন্ন হওয়ায় এসআরবিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করার সুযোগ রাখাটা যৌক্তিক নয়। অন্যদিকে, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা প্রদান এবং নাগরিকদের অভিযোগের সুযোগ রাখা র‍্যাবের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে খসড়ায় মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে দ্রুত অভিযান পরিচালনার বিস্তারিত নীতিমালা অনুপস্থিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।