লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোর বোর্ডে এসএসসির ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত

যশোর শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত গত তিনটি পরীক্ষায় পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মতিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসের হার বাড়ানোর জন্য বাড়তি নির্দেশনা দেওয়া হতো। তিনি বলেন, 'আগে বলে দেওয়া হতো, পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দেবেন। এখন তো আর এমনটি নেই। আমরা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না। পাসের হার বাড়ুক, এটা আমরাও চাই, কিন্তু তা কোনো অসাধু পন্থায় নয়।'

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে হয় ৭৫টি এবং ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৯১.৪৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি, তবে ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল দুটি এবং এবার তা বেড়ে হয়েছে ১১টি।

বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী জানান, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি এবং ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতাকেও তিনি ফলাফলের এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যেমন পরীক্ষা দিয়েছে, ফলও হয়েছে তেমন।'

এ বছর যশোর বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২,৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৬ সালে ফেলের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.৭৩ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭.৩৯ শতাংশ বেশি।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ২০ হাজার ৭৬১ জন জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জনে। তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৪৪.৭২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শা উপজেলার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল। এছাড়া সাতক্ষীরার নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল, সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চবিদ্যালয় এবং বাগেরহাটের ডিএন একতা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে এই তালিকায়।

একজন পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'আওয়ামী আমলে আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে হবে। এখন সেই বাস্তবতা নেই। ফলে যারা ঠিকমতো লেখাপড়া করেছে, তাদের ফলাফল সে অনুযায়ী হয়েছে।'

বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন। সে হিসাবে পাস করতে পারেনি ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৫ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেলের হার বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের হিসাবে অধোগতি আরো স্পষ্ট। ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ১৯৩। ২০২৪ সালে আবার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭৫টিতে। এবার এই সংখ্যা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে। ২০২২ সালের ৫১৩টি থেকে ২০২৬ সালের ৩৬টিতে নামার অর্থ হলো, চার বছরের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৯২.৯৮ শতাংশ।

জনপ্রিয় সংবাদ

একাধিক সার ডিলারশিপের মালিকানায় নিষেধাজ্ঞা জারি করল কৃষি মন্ত্রণালয়

যশোর বোর্ডে এসএসসির ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৪৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

যশোর শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত গত তিনটি পরীক্ষায় পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যশোর শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মতিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাসের হার বাড়ানোর জন্য বাড়তি নির্দেশনা দেওয়া হতো। তিনি বলেন, 'আগে বলে দেওয়া হতো, পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দেবেন। এখন তো আর এমনটি নেই। আমরা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না। পাসের হার বাড়ুক, এটা আমরাও চাই, কিন্তু তা কোনো অসাধু পন্থায় নয়।'

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে হয় ৭৫টি এবং ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৯১.৪৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি, তবে ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল দুটি এবং এবার তা বেড়ে হয়েছে ১১টি।

বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী জানান, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি এবং ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতাকেও তিনি ফলাফলের এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যেমন পরীক্ষা দিয়েছে, ফলও হয়েছে তেমন।'

এ বছর যশোর বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২,৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৬ সালে ফেলের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.৭৩ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭.৩৯ শতাংশ বেশি।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ২০ হাজার ৭৬১ জন জিপিএ-৫ পেলেও ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জনে। তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৪৪.৭২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শা উপজেলার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল। এছাড়া সাতক্ষীরার নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল, সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চবিদ্যালয় এবং বাগেরহাটের ডিএন একতা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রয়েছে এই তালিকায়।

একজন পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'আওয়ামী আমলে আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে হবে। এখন সেই বাস্তবতা নেই। ফলে যারা ঠিকমতো লেখাপড়া করেছে, তাদের ফলাফল সে অনুযায়ী হয়েছে।'

বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন। সে হিসাবে পাস করতে পারেনি ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৫ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেলের হার বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের হিসাবে অধোগতি আরো স্পষ্ট। ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ১৯৩। ২০২৪ সালে আবার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭৫টিতে। এবার এই সংখ্যা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে। ২০২২ সালের ৫১৩টি থেকে ২০২৬ সালের ৩৬টিতে নামার অর্থ হলো, চার বছরের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৯২.৯৮ শতাংশ।