লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তীব্র গ্যাস-সংকটে ঢাকার সিএনজিচালকেরা, দীর্ঘ লাইনে কাটছে দিন

রাজধানীর সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের দিনের একটি বড় অংশ এখন কাটছে গ্যাসের অপেক্ষায়। গত তিন সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে চালকদের আয় কমে গেছে এবং অনেকেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। রাজধানীর শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, মধ্যরাত কিংবা ভোর থেকে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। সিএনজি স্টেশনের সামনে অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট পিকআপ ভ্যানের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন।

যাত্রাবাড়ী থেকে এসে সকাল সাড়ে আটটায় শ্যামলীর সাহিল ফিলিং স্টেশনের গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবুল বাশার। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর দুই দফায় তিনি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। বাশার জানান, প্রথমবারে তিনি ৩০ টাকার গ্যাস পান, যা দিয়ে এক ঘণ্টাও গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। পরে অনুরোধ করে আরও ৩০ টাকার গ্যাস পান। এই সামান্য গ্যাসে যতটুকু চলা যায় চালিয়ে, শেষ হলে তাকে আবারও লাইনে দাঁড়াতে হবে। আগে সব খরচ বাদে প্রতিদিন বাশারের ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন গ্যাস-সংকটে গাড়ির মালিকের দৈনিক জমা দিতেই তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বরিশালে থাকা তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের খরচের জন্য এক মাস ধরে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।

সাহিল ফিলিং স্টেশনের কর্মী আবদুল্লাহ জানান, গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় তারা চাহিদামতো গ্যাস দিতে পারছেন না। অনেক চালক একটু বেশি গ্যাস পাওয়ার আশায় নাস্তার টাকা দিতে চাইলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় তাদের পক্ষে বেশি গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

একই চিত্র দেখা গেছে কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনের সামনেও। সেখানে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন উবারে গাড়ি চালানো মোহাম্মদ বাবুল। বাড্ডা থেকে এসে আগের দিন সারা দিন গাড়ি চালিয়ে রাত ১২টায় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ স্টেশনের মেশিনে ত্রুটি দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাবুল কোনো গ্যাস পাননি এবং অন্য কোনো স্টেশনে যাওয়ার মতো জ্বালানিও তাঁর গাড়িতে ছিল না। বাবুল জানান, গত ১৫ দিনের বেশির ভাগ রাতেই তিনি বাসায় ফিরতে পারেননি। দিনে গাড়ি চালিয়ে রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। কখনো ভোররাতে বা সকালে বাসায় ফিরে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার বের হতে হচ্ছে। আগে প্রতিদিন এক হাজার টাকার গ্যাস নিলেও এখন পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার গ্যাস। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এমন চলতে থাকলে গাড়ি চালানো বন্ধ করে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।

খালেক ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার আব্দুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই গাড়িগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করতে বেশি সময় লাগছে। এর মধ্যে মেশিনে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় কিছু সময় গ্যাস দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেশিন ঠিক হলে আবারও সরবরাহ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ের ওপর। গাবতলীর নন্দারবাগ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ চালক শাহ আলম জানান, প্রতিদিন গাড়ির মালিকের জমা ১ হাজার ১০০ টাকা এবং গ্যাস ও খাবার খরচ মিলিয়ে তাঁর দৈনিক খরচ প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু গ্যাসের লাইনে দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়ায় আগের মতো আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে থাকা তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালাতে এবং গত মাসের ঘাটতি মেটাতে গ্রামের একটি সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে তাঁকে। এই ঋণ চলতি মাসে শোধ করার কথা থাকলেও আয় না বাড়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না, উল্টো এই মাসেও নতুন করে ঋণ নেওয়ার দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাজিরায় আদালতের নির্দেশে বিএনপি নেতার অবৈধ দখলকৃত দোকান সিলগালা

তীব্র গ্যাস-সংকটে ঢাকার সিএনজিচালকেরা, দীর্ঘ লাইনে কাটছে দিন

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:২০:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানীর সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের দিনের একটি বড় অংশ এখন কাটছে গ্যাসের অপেক্ষায়। গত তিন সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে চালকদের আয় কমে গেছে এবং অনেকেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। রাজধানীর শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত পাঁচটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, মধ্যরাত কিংবা ভোর থেকে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। সিএনজি স্টেশনের সামনে অটোরিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট পিকআপ ভ্যানের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন।

যাত্রাবাড়ী থেকে এসে সকাল সাড়ে আটটায় শ্যামলীর সাহিল ফিলিং স্টেশনের গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবুল বাশার। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর দুই দফায় তিনি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। বাশার জানান, প্রথমবারে তিনি ৩০ টাকার গ্যাস পান, যা দিয়ে এক ঘণ্টাও গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। পরে অনুরোধ করে আরও ৩০ টাকার গ্যাস পান। এই সামান্য গ্যাসে যতটুকু চলা যায় চালিয়ে, শেষ হলে তাকে আবারও লাইনে দাঁড়াতে হবে। আগে সব খরচ বাদে প্রতিদিন বাশারের ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন গ্যাস-সংকটে গাড়ির মালিকের দৈনিক জমা দিতেই তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বরিশালে থাকা তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের খরচের জন্য এক মাস ধরে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারছেন না তিনি।

সাহিল ফিলিং স্টেশনের কর্মী আবদুল্লাহ জানান, গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় তারা চাহিদামতো গ্যাস দিতে পারছেন না। অনেক চালক একটু বেশি গ্যাস পাওয়ার আশায় নাস্তার টাকা দিতে চাইলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় তাদের পক্ষে বেশি গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

একই চিত্র দেখা গেছে কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনের সামনেও। সেখানে লাইনে অপেক্ষা করছিলেন উবারে গাড়ি চালানো মোহাম্মদ বাবুল। বাড্ডা থেকে এসে আগের দিন সারা দিন গাড়ি চালিয়ে রাত ১২টায় গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ স্টেশনের মেশিনে ত্রুটি দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাবুল কোনো গ্যাস পাননি এবং অন্য কোনো স্টেশনে যাওয়ার মতো জ্বালানিও তাঁর গাড়িতে ছিল না। বাবুল জানান, গত ১৫ দিনের বেশির ভাগ রাতেই তিনি বাসায় ফিরতে পারেননি। দিনে গাড়ি চালিয়ে রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। কখনো ভোররাতে বা সকালে বাসায় ফিরে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার বের হতে হচ্ছে। আগে প্রতিদিন এক হাজার টাকার গ্যাস নিলেও এখন পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার গ্যাস। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এমন চলতে থাকলে গাড়ি চালানো বন্ধ করে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।

খালেক ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার আব্দুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই গাড়িগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করতে বেশি সময় লাগছে। এর মধ্যে মেশিনে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় কিছু সময় গ্যাস দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেশিন ঠিক হলে আবারও সরবরাহ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে চালকদের আয়ের ওপর। গাবতলীর নন্দারবাগ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ চালক শাহ আলম জানান, প্রতিদিন গাড়ির মালিকের জমা ১ হাজার ১০০ টাকা এবং গ্যাস ও খাবার খরচ মিলিয়ে তাঁর দৈনিক খরচ প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু গ্যাসের লাইনে দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়ায় আগের মতো আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে থাকা তাঁর ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালাতে এবং গত মাসের ঘাটতি মেটাতে গ্রামের একটি সমিতি থেকে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে তাঁকে। এই ঋণ চলতি মাসে শোধ করার কথা থাকলেও আয় না বাড়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না, উল্টো এই মাসেও নতুন করে ঋণ নেওয়ার দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।