লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেসব ভুলের কারণে দান-সদকার কোনো প্রতিদান মেলে না

ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হলেও কিছু ভুলের কারণে এই মহৎ আমলটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালীন কল্যাণের আশায় মানুষ অনাথ, অসহায়দের সাহায্য করে কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেয়। তবে নিয়তের অসততা ও শরিয়ত পরিপন্থী আচরণের কারণে অনেক সময় দাতার আমলনামায় কোনো প্রতিদানই জোটে না।

দান কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তা হালাল ও বৈধ উপায়ে অর্জিত হতে হবে। হারাম বা অবৈধ উপার্জনের অর্থ দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা বা গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করলে আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয় না এবং এর কোনো প্রতিদান পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা যা-কিছু উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা কিছু উৎপন্ন করেছি, তার উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো থেকে একটি অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। আর এরূপ মন্দ জিনিস (আল্লাহর নামে) দেওয়ার নিয়ত কর না, যা (অন্য কেউ তোমাদেরকে দিলে ঘৃণার কারণে) তোমরা চোখ বন্ধ না করে তা গ্রহণ করবে না। মনে রেখ, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সর্বপ্রকার প্রশংসা তাঁরই।’ এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের ১০১৪ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা হালাল সম্পদ থেকে কিছু সদকা করে, আর আল্লাহতায়ালা শুধু হালাল বস্তুই গ্রহণ করেন, তখন রহমান তা ডান হাতে গ্রহণ করেন, যদিও তা একটি খেজুর পরিমাণ হয়। অতঃপর দানটি রহমানের হাতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি তা পাহাড়ের চেয়েও বড় ও বিরাট হয়ে যায়। যেভাবে তোমাদের কেউ উটের বাচ্চা লালিত-পালিত করে বড় করে তোলে।’

লোক দেখানোর মানসিকতা বা ‘রিয়া’ দান-সদকার সওয়াব ধ্বংসের আরেকটি বড় কারণ। মহৎ উদ্দেশ্যে অঢেল অর্থ ব্যয় করার পরও যদি লক্ষ্য থাকে মানুষের প্রশংসা কুড়ানো, তবে পরকালে এর কোনো মূল্য থাকে না; বরং যাবতীয় চেষ্টা-মেহনত বিফলে যায়। সূরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘(তোমরা তোমাদের দান-সদকা বরবাদ কোরো না ওই ব্যক্তির মতো) যে লোক দেখানোর উদ্দেশে আপন সম্পদ ব্যয় করে এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করে প্রতিদান পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। সহিহ মুসলিমের ১৯০৫ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে তিন শ্রেণির মানুষের বিচার করা হবে, তাদের মধ্যে লোক দেখানো দানকারী ধনী ব্যক্তি অন্যতম। সে আল্লাহর কাছে দাবি করবে যে তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই সব প্রিয় ও পছন্দনীয় পথে খরচ করেছে, কিন্তু আল্লাহ বলবেন, ‘মিথ্যা বলছ। তোমাদের দানের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমাদেরকে দানবীর বলা হবে। আর তা বলা হয়ে গেছে।’ এরপর তাকে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। একইভাবে লোক দেখানো জিহাদকারী শহীদ এবং ইলম অর্জনকারী আলেমকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

দান করার পর গ্রহীতাকে খোটা দেওয়া বা তাকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ, যা পুণ্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। আল্লাহতায়ালা সূরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সদকাগুলোকে খোটাদান ও কষ্টদানের মাধ্যমে বরবাদ কোরো না।’ এর মাধ্যমে প্রতিদান তো নষ্ট হয়ই, উপরন্তু দাতা আল্লাহতায়ালার চরম রোষানলে পড়ে। তিরমিজি শরিফের ১২১১ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। এই ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ তিন শ্রেণির একজন হলো ‘খোটা দানকারী’ (অন্য দুজন হলো টাখনুর নিচে লুঙ্গি পরিধানকারী এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রেতা)।

দান-সদকাকে পরকালীন মুক্তির উসিলা বানাতে হলে নিয়তের বিশুদ্ধতা অপরিহার্য। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিসেই বলা হয়েছে, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যে যেমন নিয়ত করবে, সে তেমন ফল পাবে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তার রাসুলের উদ্দেশেই বিবেচিত হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া হাসিলের উদ্দেশে কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশে হবে, তার হিজরত উক্ত উদ্দেশেই বিবেচিত হবে।’ অথচ দান-সদকার স্বাভাবিক ফজিলত অপরিসীম। সুরা হাদীদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি দাতার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।’ সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কোনো পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না পছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।’ মুসনাদে আহমদের ১৭৩৩৩ নম্বর হাদিসে উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষ কেয়ামতের দিন তার সদকার ছায়াতলে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে ফয়সালা করা হবে।’ তাই সব ধরনের রিয়া, খোটা এবং অবৈধ উপার্জন পরিহার করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করা উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

যেসব ভুলের কারণে দান-সদকার কোনো প্রতিদান মেলে না

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হলেও কিছু ভুলের কারণে এই মহৎ আমলটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালীন কল্যাণের আশায় মানুষ অনাথ, অসহায়দের সাহায্য করে কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেয়। তবে নিয়তের অসততা ও শরিয়ত পরিপন্থী আচরণের কারণে অনেক সময় দাতার আমলনামায় কোনো প্রতিদানই জোটে না।

দান কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তা হালাল ও বৈধ উপায়ে অর্জিত হতে হবে। হারাম বা অবৈধ উপার্জনের অর্থ দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা বা গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করলে আল্লাহর দরবারে তা গৃহীত হয় না এবং এর কোনো প্রতিদান পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা যা-কিছু উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা কিছু উৎপন্ন করেছি, তার উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো থেকে একটি অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। আর এরূপ মন্দ জিনিস (আল্লাহর নামে) দেওয়ার নিয়ত কর না, যা (অন্য কেউ তোমাদেরকে দিলে ঘৃণার কারণে) তোমরা চোখ বন্ধ না করে তা গ্রহণ করবে না। মনে রেখ, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সর্বপ্রকার প্রশংসা তাঁরই।’ এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের ১০১৪ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা হালাল সম্পদ থেকে কিছু সদকা করে, আর আল্লাহতায়ালা শুধু হালাল বস্তুই গ্রহণ করেন, তখন রহমান তা ডান হাতে গ্রহণ করেন, যদিও তা একটি খেজুর পরিমাণ হয়। অতঃপর দানটি রহমানের হাতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি তা পাহাড়ের চেয়েও বড় ও বিরাট হয়ে যায়। যেভাবে তোমাদের কেউ উটের বাচ্চা লালিত-পালিত করে বড় করে তোলে।’

লোক দেখানোর মানসিকতা বা ‘রিয়া’ দান-সদকার সওয়াব ধ্বংসের আরেকটি বড় কারণ। মহৎ উদ্দেশ্যে অঢেল অর্থ ব্যয় করার পরও যদি লক্ষ্য থাকে মানুষের প্রশংসা কুড়ানো, তবে পরকালে এর কোনো মূল্য থাকে না; বরং যাবতীয় চেষ্টা-মেহনত বিফলে যায়। সূরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘(তোমরা তোমাদের দান-সদকা বরবাদ কোরো না ওই ব্যক্তির মতো) যে লোক দেখানোর উদ্দেশে আপন সম্পদ ব্যয় করে এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করে প্রতিদান পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। সহিহ মুসলিমের ১৯০৫ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে তিন শ্রেণির মানুষের বিচার করা হবে, তাদের মধ্যে লোক দেখানো দানকারী ধনী ব্যক্তি অন্যতম। সে আল্লাহর কাছে দাবি করবে যে তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই সব প্রিয় ও পছন্দনীয় পথে খরচ করেছে, কিন্তু আল্লাহ বলবেন, ‘মিথ্যা বলছ। তোমাদের দানের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমাদেরকে দানবীর বলা হবে। আর তা বলা হয়ে গেছে।’ এরপর তাকে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। একইভাবে লোক দেখানো জিহাদকারী শহীদ এবং ইলম অর্জনকারী আলেমকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

দান করার পর গ্রহীতাকে খোটা দেওয়া বা তাকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ, যা পুণ্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। আল্লাহতায়ালা সূরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সদকাগুলোকে খোটাদান ও কষ্টদানের মাধ্যমে বরবাদ কোরো না।’ এর মাধ্যমে প্রতিদান তো নষ্ট হয়ই, উপরন্তু দাতা আল্লাহতায়ালার চরম রোষানলে পড়ে। তিরমিজি শরিফের ১২১১ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। এই ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ তিন শ্রেণির একজন হলো ‘খোটা দানকারী’ (অন্য দুজন হলো টাখনুর নিচে লুঙ্গি পরিধানকারী এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রেতা)।

দান-সদকাকে পরকালীন মুক্তির উসিলা বানাতে হলে নিয়তের বিশুদ্ধতা অপরিহার্য। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিসেই বলা হয়েছে, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যে যেমন নিয়ত করবে, সে তেমন ফল পাবে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তার রাসুলের উদ্দেশেই বিবেচিত হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া হাসিলের উদ্দেশে কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশে হবে, তার হিজরত উক্ত উদ্দেশেই বিবেচিত হবে।’ অথচ দান-সদকার স্বাভাবিক ফজিলত অপরিসীম। সুরা হাদীদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি দাতার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।’ সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কোনো পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না পছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।’ মুসনাদে আহমদের ১৭৩৩৩ নম্বর হাদিসে উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষ কেয়ামতের দিন তার সদকার ছায়াতলে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে ফয়সালা করা হবে।’ তাই সব ধরনের রিয়া, খোটা এবং অবৈধ উপার্জন পরিহার করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করা উচিত।