লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুঠোফোনে ঋণের ফাঁদ: উচ্চ সুদে জিম্মি গ্রাহক, তথ্য চুরির ভয়

বেসরকারি চাকরিজীবী শাহীন হোসেন গত জুনে মুঠোফোনে একটি অ্যাপের মাধ্যমে তিন ধাপে ৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। মাসখানেক মেয়াদের এই ঋণে তাঁকে শোধ করতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা, যার অর্থ সুদের হার ৮০০ শতাংশ। শাহীন হোসেন প্রথম আলোকে জানান, বেশি টাকা দাবির প্রতিবাদ করায় তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়া হয় যে তাঁর মুঠোফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হবে এবং আত্মীয়স্বজনের নম্বরে ফোন করা হবে। প্রতিদিন সুদ বাড়ছিল এবং হুমকি আসছিল, এক পর্যায়ে তিনি টাকা শোধ করে দেন। শাহীন যে অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিলেন, সেটির নাম ফিনক্যাশ।

প্রথম আলো বাংলাদেশে এমন অন্তত ৩০টি অ্যাপের খোঁজ পেয়েছে, যেগুলো অবৈধভাবে ঋণ দেয়। এসব অ্যাপের নিয়ন্ত্রকেরা ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে। কেউ ঋণ নিতে অ্যাপ ডাউনলোড করলে ব্যক্তির অজান্তেই তাঁর মুঠোফোন থেকে ছবি, ভিডিও, সবার নম্বর ও খুদে বার্তাসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে নেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে উচ্চ সুদ দাবি করা হয় এবং পরিশোধ না করলে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপে অবৈধ ঋণদানের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে ডিজিটাল ঋণের অ্যাপের প্রতারণার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে।

বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন হলেও ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বরের এক খবরে বলা হয়, অন্ধ্র প্রদেশে নরেন্দ্র (২৫) নামের এক তরুণ বিয়ের পর একটি অ্যাপ থেকে দুই হাজার রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। অতিরিক্ত টাকা দাবি ও পরিশোধ না করায় তাঁর নববধূর বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির মুখে তিনি আত্মহত্যা করেন। এটি ভারতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপের হয়রানির শিকার হয়ে মৃত্যুর আরও একটি ঘটনা।

দেশে বৈধভাবে ঋণ দেয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ২০২৪ সালের জুনের হিসাব বলছে, ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ অ্যাপে ঋণ দেয়। এই বিপুল ঋণবাজারের বাইরে জরুরি ও সহজ ঋণের চাহিদা থাকায় বিভিন্ন অ্যাপ সেই সুযোগ নিচ্ছে। অথচ দেশে অনুমোদনহীন ঋণ বিতরণ, অনলাইন জুয়া, ফরেক্স ট্রেডিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন নিষিদ্ধ।

সিমিলারওয়েবের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে জনপ্রিয় অর্থবিষয়ক অ্যাপের তালিকায় বিটকয়েন, অনলাইন ট্রেডিং ও ঋণ অ্যাপগুলো রয়েছে। ফেসবুকের বিজ্ঞাপন ও গুগল প্লে স্টোর ঘেঁটে অন্তত ৩০টি অ্যাপ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী ও লোনহাট অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে সুপরিচিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের নামও কৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন ‘সাথী লোন’ অ্যাপটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্লে স্টোরে আসার পর এক লাখের বেশিবার এবং ‘কুইক লোন’ অ্যাপটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে আসার পর পাঁচ লাখের বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে।

মিরপুরের বাসিন্দা সাঈদ মিয়া জানান, তিনি ২৪ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু এক সপ্তাহ পরই সুদসহ বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা। ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধের পরও বাকি টাকার জন্য পরিচিতদের ফোন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। ভুক্তভোগীরা জানান, ঋণের আবেদনের সময় এনআইডি ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবা নম্বর চাওয়া হয়। অ্যাপ ইনস্টলের সময় ফোনবুক, ছবি ও খুদে বার্তা ব্যবহারের অনুমতি না দিলে ঋণ পাওয়া যায় না। এসব অ্যাপের পরিচালনাকারীদের কোনো অফিস বা ঠিকানা নেই। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে এসব চক্রের চুরি করা অর্থের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা)। ভারত সরকার গত জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭১৮টি অবৈধ অ্যাপ বন্ধ করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রতারণা ভয়ংকর পর্যায়ে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণে এই অপরাধগুলো ঘটেই চলেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি বিক্রির দাবি হ্যাকারদের

মুঠোফোনে ঋণের ফাঁদ: উচ্চ সুদে জিম্মি গ্রাহক, তথ্য চুরির ভয়

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:২৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

বেসরকারি চাকরিজীবী শাহীন হোসেন গত জুনে মুঠোফোনে একটি অ্যাপের মাধ্যমে তিন ধাপে ৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। মাসখানেক মেয়াদের এই ঋণে তাঁকে শোধ করতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা, যার অর্থ সুদের হার ৮০০ শতাংশ। শাহীন হোসেন প্রথম আলোকে জানান, বেশি টাকা দাবির প্রতিবাদ করায় তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়া হয় যে তাঁর মুঠোফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হবে এবং আত্মীয়স্বজনের নম্বরে ফোন করা হবে। প্রতিদিন সুদ বাড়ছিল এবং হুমকি আসছিল, এক পর্যায়ে তিনি টাকা শোধ করে দেন। শাহীন যে অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিলেন, সেটির নাম ফিনক্যাশ।

প্রথম আলো বাংলাদেশে এমন অন্তত ৩০টি অ্যাপের খোঁজ পেয়েছে, যেগুলো অবৈধভাবে ঋণ দেয়। এসব অ্যাপের নিয়ন্ত্রকেরা ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে। কেউ ঋণ নিতে অ্যাপ ডাউনলোড করলে ব্যক্তির অজান্তেই তাঁর মুঠোফোন থেকে ছবি, ভিডিও, সবার নম্বর ও খুদে বার্তাসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে নেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে উচ্চ সুদ দাবি করা হয় এবং পরিশোধ না করলে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপে অবৈধ ঋণদানের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে ডিজিটাল ঋণের অ্যাপের প্রতারণার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে।

বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন হলেও ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বরের এক খবরে বলা হয়, অন্ধ্র প্রদেশে নরেন্দ্র (২৫) নামের এক তরুণ বিয়ের পর একটি অ্যাপ থেকে দুই হাজার রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। অতিরিক্ত টাকা দাবি ও পরিশোধ না করায় তাঁর নববধূর বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির মুখে তিনি আত্মহত্যা করেন। এটি ভারতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপের হয়রানির শিকার হয়ে মৃত্যুর আরও একটি ঘটনা।

দেশে বৈধভাবে ঋণ দেয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) ২০২৪ সালের জুনের হিসাব বলছে, ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ অ্যাপে ঋণ দেয়। এই বিপুল ঋণবাজারের বাইরে জরুরি ও সহজ ঋণের চাহিদা থাকায় বিভিন্ন অ্যাপ সেই সুযোগ নিচ্ছে। অথচ দেশে অনুমোদনহীন ঋণ বিতরণ, অনলাইন জুয়া, ফরেক্স ট্রেডিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন নিষিদ্ধ।

সিমিলারওয়েবের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে জনপ্রিয় অর্থবিষয়ক অ্যাপের তালিকায় বিটকয়েন, অনলাইন ট্রেডিং ও ঋণ অ্যাপগুলো রয়েছে। ফেসবুকের বিজ্ঞাপন ও গুগল প্লে স্টোর ঘেঁটে অন্তত ৩০টি অ্যাপ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী ও লোনহাট অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে সুপরিচিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের নামও কৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন ‘সাথী লোন’ অ্যাপটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্লে স্টোরে আসার পর এক লাখের বেশিবার এবং ‘কুইক লোন’ অ্যাপটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে আসার পর পাঁচ লাখের বেশিবার ডাউনলোড হয়েছে।

মিরপুরের বাসিন্দা সাঈদ মিয়া জানান, তিনি ২৪ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু এক সপ্তাহ পরই সুদসহ বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা। ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধের পরও বাকি টাকার জন্য পরিচিতদের ফোন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। ভুক্তভোগীরা জানান, ঋণের আবেদনের সময় এনআইডি ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবা নম্বর চাওয়া হয়। অ্যাপ ইনস্টলের সময় ফোনবুক, ছবি ও খুদে বার্তা ব্যবহারের অনুমতি না দিলে ঋণ পাওয়া যায় না। এসব অ্যাপের পরিচালনাকারীদের কোনো অফিস বা ঠিকানা নেই। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে এসব চক্রের চুরি করা অর্থের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা)। ভারত সরকার গত জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭১৮টি অবৈধ অ্যাপ বন্ধ করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রতারণা ভয়ংকর পর্যায়ে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণে এই অপরাধগুলো ঘটেই চলেছে।